
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত চার দিনের চীন সফরকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। সফরটি শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেনি, বরং ঢাকা ও বেইজিংয়ের সম্পর্ককে একটি নতুন রাজনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন তাৎক্ষণিক কোনো ঋণ বা প্রকল্প ঘোষণা নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের নতুন ভিত্তি প্রতিষ্ঠা।
সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন সম্প্রদায়’ গঠনের সিদ্ধান্ত। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণা কেবল প্রতীকী নয়; বরং আগামী কয়েক দশকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ দফার একটি যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, এসব সমঝোতার মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতা, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই), মানবসম্পদ উন্নয়ন, চীনা ভাষা শিক্ষা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সফরের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) চীনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে চীনের আগ্রহকে বড় ধরনের কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হতে পারে।
সফরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর গঠনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ ব্যবস্থায় আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করতে পারে।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
২০১৬ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যোগ দেওয়ার পর এবার বাংলাদেশ চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) সম্পৃক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের জন্য নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে।
দুই দেশ কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর সম্ভাবনা যাচাই করতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি সামরিক প্রশিক্ষণ, উচ্চপর্যায়ের সফর এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এ ধরনের সহযোগিতা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সবুজ উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তথ্যপ্রযুক্তি এবং নিম্ন-কার্বন উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এছাড়া চীনের শীর্ষ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের পর মালয়েশিয়ার পরই চীন সফরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে—ঢাকা বহুমুখী, ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চায়।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ এটিও স্পষ্ট করেছে যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে থাকবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন গতি দেবে। গভীরতর দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।”
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, “চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং উভয় দেশই এর সুফল পাবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে স্বাক্ষরিত চুক্তি ও সমঝোতাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। তবে রাজনৈতিক আস্থা বৃদ্ধি, তিস্তা প্রকল্পে সমর্থন, নতুন উন্নয়ন উদ্যোগে অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে এই সফরকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সম্পাদক : মোহাম্মদ জিয়াউল হক, প্রকাশক : আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ
Contact : +8801822288799 (WhatsApp), E-mail : muktomonnews@gmail.com, Office : 56, A.H Tower (4th Floor), Sector-3, Road-2, Azampur, Uttara, Dhaka-1230.
© All rights reserved by Weekly MUKTOMON - 2024-25