নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর নিকুঞ্জ-২ এর টানপাড়া পশ্চিমপাড়া এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট যেন নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। গত প্রায় দুই বছর ধরে অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এলাকার হাজারো বাসিন্দা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) আওতাধীন ZT100 নম্বর ট্রান্সফরমারটি দীর্ঘদিন ধরে বর্তমান চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত লোড বহন করছে। ফলে দিনের যেকোনো সময় কিংবা গভীর রাতেও হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, বহুবার অভিযোগ জানিয়ে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ সচল করা হলেও স্থায়ী সমাধানে এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে টানপাড়া পশ্চিমপাড়ায় দ্রুত নগরায়ণ হয়েছে। একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণের পাশাপাশি জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ফ্রিজ, পানির পাম্প, ওভেনসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
তবে এই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, ZT100 ট্রান্সফরমারটি দীর্ঘদিন ধরেই তার সক্ষমতার চেয়ে বেশি লোড বহন করছে। ফলে সামান্য চাপ বাড়লেই ট্রান্সফরমার ট্রিপ করে কিংবা বিকল হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা নাজমুল হ্যাভেন বলেন, “দুই বছর ধরে আমরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছি। দিনে হোক বা রাতে, কখন বিদ্যুৎ চলে যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ছোট শিশু ও বয়স্ক মানুষদের নিয়ে গরমে রাত কাটানো খুবই কষ্টকর। আমরা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করি। তাহলে কেন এই মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হব?”
একই এলাকার বাসিন্দা মতিউর রহমান স্বপন বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকা এখন যেন আমাদের এলাকার নিয়মিত ঘটনা। ফ্রিজের খাবার নষ্ট হচ্ছে, গরমে বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বারবার অভিযোগ করেও স্থায়ী সমাধান পাচ্ছি না। আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না; শুধু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাই।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব শুধু আবাসিক জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়। ছোট দোকান, সেলুন, দর্জির কারখানা, ফটোকপির দোকানসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসা নিয়মিত ক্ষতির মুখে পড়ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প চালানো সম্ভব না হওয়ায় অনেক সময় পুরো এলাকায় পানির সংকটও দেখা দিচ্ছে।
বর্তমানে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলমান থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার। অনেক শিক্ষার্থী রাতে পড়াশোনার সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চার্জার লাইট, মোমবাতি কিংবা মোবাইল ফোনের আলোয় পড়তে বাধ্য হচ্ছে।
এদিকে চলমান আন্তর্জাতিক ফুটবল আসরের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর সময়ও বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে খেলা উপভোগের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংকট এখন শুধু দৈনন্দিন জীবন নয়, মানুষের স্বাভাবিক আনন্দ-বিনোদনও কেড়ে নিচ্ছে।
নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির আহ্বায়ক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল বলেন, “রাজধানীর একটি এলাকায় একই সমস্যার সমাধান দুই বছরেও না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ডেসকো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎসেবার প্রতিশ্রুতি দিলেও টানপাড়া পশ্চিমপাড়ার বাস্তবতা সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”
তিনি আরও বলেন, “একটি এলাকার বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে—এটি ডেসকোর অজানা থাকার কথা নয়। বর্তমান ZT100 ট্রান্সফরমারটি এলাকার বিদ্যমান লোড বহন করতে পারছে না। তাই বারবার সাময়িক মেরামত করে সমস্যার সমাধান হবে না। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনই একমাত্র কার্যকর সমাধান।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাক্কের হোসেন বলেন, “বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা হবে। যদি ট্রান্সফরমারের সক্ষমতা বৃদ্ধি বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎসেবা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। এলাকাবাসীর ভোগান্তি কমাতে যা যা করণীয়, তা ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করা হবে।”
বিদ্যুৎ খাত–সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বর্তমান ZT100 ট্রান্সফরমারের পরিবর্তে অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন, প্রয়োজনীয় ফিডার লাইন আধুনিকায়ন এবং নিয়মিত লোড অডিট পরিচালনার বিকল্প নেই।
নিকুঞ্জ টানপাড়া পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, দুই বছর ধরে চলা সাময়িক ‘জোড়াতালি’ নির্ভর সমাধানের পরিবর্তে এবার স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কারণ, রাজধানীর একটি এলাকায় হাজারো মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে একটি মৌলিক নাগরিক সেবা পরিচালনা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সম্পাদক : মোহাম্মদ জিয়াউল হক, প্রকাশক : আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ
Contact : +8801822288799 (WhatsApp), E-mail : muktomonnews@gmail.com, Office : 56, A.H Tower (4th Floor), Sector-3, Road-2, Azampur, Uttara, Dhaka-1230.
© All rights reserved by Weekly MUKTOMON - 2024-25