সপ্তাহখানেক আগে ধানমন্ডির একটা কফিশপে আমার সাথে ৬-৭ জন তরুণ সালাম দিয়ে কুশলাদি বিনিময় করেন, পরিচয় দিলেন তারা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনালসে অধ্যয়নরত৷ একটা ছবি তুলে তারা বলেন, "ভাইয়া আগে যখন ক্রিকেট দেখতাম, তখন আপনার অ্যানালাইসিস রেগুলার দেখতাম, এখন ক্রিকেটও দেখা হয় না, তাই আপনাকেও দেখা হয় না৷ "
আমি জিজ্ঞেস করলাম ক্রিকেট দেখেন না কেন? তারা উত্তর দিলেন, "বাংলাদেশ তো খালি হারে, তাই দেখি না, ফুটবল দেখি"৷ আমি বললাম রেজাল্টের কথা চিন্তা করলে ফুটবল, ক্রিকেট দুইটাই তো আমরা হারি৷ ওদের উত্তর ছিল, " ফুটবলে তো কোন টক্সিক নিউজ সামনে আসে না, যা আসে মাঠের খেলাকে বেইজ করে, কোন টক্সিসিটি নাই"..
আমি বললাম, আচ্ছা। এরপর কিছু একটা বলতে যাওয়ার আগে ওদের প্রশ্ন, "ভাইয়া কি চলতেসে ক্রিকেট বোর্ডে? বুলবুল সাহেব কতদিন থাকবে?"
আমি উত্তর দিলাম, জানি না ভাইয়া৷ এসব ক্রিকেট সিস্টেম নিয়ে ভাবি না এখন৷ আগে ভাবতাম, যেদিন বিসিবি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা থেকে রিজাইন দিয়ে চলে আসছি এরপর থেকে এসব নিয়ে ভাবি না৷ নিজেকে নিয়ে ভাবি, আর ক্রিকেট নিয়ে ভাবলে শুধু মাঠের ক্রিকেট আর টেকনিকাল অ্যানালাইস নিয়ে ভাবি৷ বাকি কিছু নিয়ে আমার আগ্রহ বা ইন্টারেস্ট নেই এখন। এদেশে কিছুই হবে না, ৫০-৬০ বছর পিছিয়েই থাকবে বিশ্ব থেকে আজীবন। শুধু শুধু নিজের পার্সোনাল লাইফ, কাজ বাদ দিয়ে এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর কোন ইচ্ছা আমার নাই৷ যমুনা টেলিভিশনে যদি সিস্টেম নিয়ে কোন উপস্থাপনাও করি, সেটা স্টেশন পলিসি অনুযায়ী যেহেতু আমার পেশা সেখানে উপস্থাপনা, সেই প্রটোকলে করি৷ আমার ব্যাক্তিগত কোন মতামত না, উপস্থাপক হিসেবে যে স্টেশনে কাজ করি সেই প্রটোকল ফলো করি৷
তবে ওদের আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা যে বললেন বাংলাদেশ ম্যাচ জেতে না- বাংলাদেশ তো পাকিস্তানকে সিরিজ হারালো ২-১ এ ঈদের আগে৷ জিতলো তো৷ ওদের চোখ কপালে, একজন আরেকজনের দিকে তাকায়৷ "কি বলেন ভাইয়া, পাকিস্তান এখানে আবার কবে খেলতে আসলো? জানলামই না "৷ আমি বললাম, বোর্ডে কি হচ্ছে না হচ্ছে এগুলো আপনারা জানেন, কিন্তু বাংলাদেশ যে পাকিস্তানের সাথে সিরিজ খেলেছে এটা জানেন না?
ওদের উত্তর, ভাইয়া এগুলো খবর সামনে আসে না তো তাই জানি না৷
ওরা যাওয়ার পর গভীর ভাবনা আসলো৷ একটা প্রজন্মের কাছে ক্রিকেটের রেপুটেশন, ক্রিকেটের ব্র্যান্ডিং এর ক্ষেত্রে মাঠের ক্রিকেটের চাইতেও বড় প্রভাবক গণমাধ্যমে কি খবর প্রচার হচ্ছে তা। গণমাধ্যম ক্রিকেটকে কিভাবে উপস্থাপন করছে সেটাই বড় প্রভাবক৷
আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়লো৷ পেশাদার ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ জন্মানোর অন্যতম বড় কারণ ছিলেন উৎপল শুভ্র৷ তখনকার প্রথম আলোতে রিচার্ড ম্যাকিন্সের হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের কার্যক্রম নিয়ে আর্টিকেল হত, ফিটনেস ড্রিল, ক্রিকেটিং লাইফস্টাইল ডিসিপ্লিন নিয়ে প্রতিবেদন হত, ওয়াহিদুল গনি স্যার, আনোয়ার স্যারদের ক্রিকেট একাডেমী নিয়ে প্রতিবেদন হত, বাংলাদেশের এ দল ইংল্যান্ডে সফরকালীন শাহরিয়ার নাফিসদের অন দ্যা ফিল্ড বিয়ন্ড দ্যা ফিল্ড ইন্টারেস্টিং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্টোরি হত৷ আমার মনে আছে ২০০৪ এর উইন্ডিজ সফরের সময় শুভ্রদার একটা ট্রাভেল ডায়েরি ছিল, "ক্যারিবিয়ান কড়চা"। লিয়াট বিভ্রাট বা বানরের কাহিনী - এগুলো পড়ার জন্য সকালে স্কুলে যেতেও লেইট হত৷ রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে তা নিয়ে আমাদের আলোচনাও হত৷ রানা হাসান, মোস্তফা মামুন বা এম এম কায়সারের নামটাও বলবো - যারা আমাদের প্রজন্মকে মাঠের ক্রিকেট এবং টক্সিসিটি বহির্ভুত ক্রিকেটে আগ্রহী করেছিলেন৷ তখনো ক্রিকেট বোর্ডের নানা অসঙ্গতি, অস্থিরতার জায়গাও হয়তো ছিল - কিন্তু আমাদের কাছে ক্রিকেটের ব্র্যান্ডিং করা হত ক্রিকেটের পজিটিভ পার্টটাই৷
ক্রিকেটের রেপুটেশন, ক্রিকেটের ব্র্যান্ডিং যাই বলি না কেন, গণমাধ্যমে বর্তমানে তো মাঠের ক্রিকেটটাই অনুপস্থিত৷
শুভ্রদাদের সেই লেখাগুলো থেকে আমার একটা অবজারভেশন ছিল, পাবলিকের রুচি অনুযায়ী নিউজ পাবলিশ করা গণমাধ্যমের কাজ না, পাবলিকের মার্জিত রুচি তৈরী করা গণমাধ্যমের কাজ৷ আপনি যখন মানুষের মার্জিত রুচি তৈরী করতে পারবেন আগের মত, তখন ক্রিকেটের রেপুটেশন বলি আর ব্র্যান্ডিং- সবই ফেরত আসবে৷ আজকে আমাকে দেখে নতুন প্রজন্মের একটা অংশ যদি ক্রিকেট বিশ্লেষণে আগ্রহ পায়, আমি বলতে পারি পেশাদার ক্রিকেটে আমার আগ্রহ তৈরী করেছিলেন উৎপল শুভ্র৷ একজন গণমাধ্যমকর্মীর এটাই তো পাওয়ার হওয়া উচিত৷
আমার মনে হয় ফুটবলে যা ব্র্যান্ডিং হয়েছে তার একটা বড় ক্রেডিট আমার বন্ধুবর নাভিল খান আর ছোটভাই রিফাত মাসুদ পাবে৷ মানুষের কাছ থেকেই শোনা, ওরা মাঠের ফুটবল নিয়ে কথা বলে বেশী। অন্তত খেলা যে একটা এন্টারটেইনমেন্ট, সেই এন্টারটেইনমেন্ট এর ফিলোসফিটা ওরা ধরে রাখিয়েছে মানুষক।
সম্পাদক : মোহাম্মদ জিয়াউল হক, প্রকাশক : আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ
Contact : +8801822288799 (WhatsApp), E-mail : muktomonnews@gmail.com, Office : 56, A.H Tower (4th Floor), Sector-3, Road-2, Azampur, Uttara, Dhaka-1230.
© All rights reserved by Weekly MUKTOMON - 2024-25