দায়মিরা আক্তার: নেপাল যেখানে জলবিদ্যুৎ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে, সেখানে বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের ডলার ব্যয় করছে জ্বালানি আমদানিতে—এই বৈপরীত্য এখন নীতিনির্ধারণী মহলে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার পার্বত্য দেশ নেপাল তার প্রাকৃতিক জলসম্পদ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটির সম্ভাব্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৪২ হাজার মেগাওয়াট, যার একটি অংশ ইতোমধ্যে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক আয় হিসেবে যুক্ত হচ্ছে। বিপরীতে বাংলাদেশ এখনো ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর, যার জন্য বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিবেচনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের পর্যাপ্ত সূর্যালোক, উপকূলীয় অঞ্চলের বায়ুপ্রবাহ এবং বিস্তৃত জলাশয়—সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ গিগাওয়াট পর্যন্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এই সম্ভাবনার খুব সামান্য অংশই কাজে লাগানো হয়েছে।
এক্ষেত্রে নীতিগত কিছু সিদ্ধান্ত ও অতীতের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত এক দশকে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘কুইক রেন্টাল’ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এর ফলে স্বল্পমেয়াদে উৎপাদন বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ ব্যয়ের বোঝা তৈরি হয়েছে বলে সমালোচকরা মনে করেন। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে না থাকলেও ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হিসেবে রাষ্ট্রকে অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে, যা সরকারি ব্যয় বাড়িয়েছে।
২০১০ সালের বিশেষ বিধানের আওতায় কিছু বিদ্যুৎ প্রকল্পে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করায় স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া জোরদার না হওয়ায় ব্যয় দক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়—বিশেষ করে জমির অভাব। তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ (ফ্লোটিং সোলার), শিল্পকারখানার ছাদ এবং সরকারি-বেসরকারি ভবনের রুফটপ ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। দেশের পুকুর ও জলাশয়ের একটি অংশ ব্যবহার করেই কয়েক গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে সরে এসে নিজস্ব নবায়নযোগ্য সম্পদের দিকে আরও জোর দেবে? সরকারি ভবনগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন, উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো উদ্যোগগুলো এখন আলোচনায় আসছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং স্বচ্ছ বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে, আত্মনির্ভরশীল ও টেকসই জ্বালানি নীতির দিকে অগ্রসর হওয়াই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
সম্পাদক : মোহাম্মদ জিয়াউল হক, প্রকাশক : আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ
Contact : +8801822288799 (WhatsApp), E-mail : muktomonnews@gmail.com, Office : 56, A.H Tower (4th Floor), Sector-3, Road-2, Azampur, Uttara, Dhaka-1230.
© All rights reserved by Weekly MUKTOMON - 2024-25