বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্র রাজনীতি একটি দীর্ঘদিনের বিতর্কিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—এই ছাত্র রাজনীতি কতটা শিক্ষাবান্ধব, আর কতটা ক্ষতিকর?
ছাত্র রাজনীতির যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই দিকই বিবেচনা করতে হয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক চর্চা নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেই হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ছাত্র রাজনীতি তরুণদের নেতৃত্বের গুণাবলি, সংগঠনিক দক্ষতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন চিত্রও তুলে ধরে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার পর পড়াশোনায় মনোযোগ হারায়। নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা বা একাডেমিক গবেষণার চেয়ে মিছিল, সমাবেশ, দলীয় কার্যক্রমই বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়, যা সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ক্যাম্পাসে দলাদলি ও সহিংসতা একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এবং অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেখানে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হওয়ার কথা, সেখানে যদি ভয় ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করে, তবে তা জাতির ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ইউরোপ, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে শিক্ষাঙ্গনে সরাসরি দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত। সেখানে শিক্ষার্থীরা রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন থাকলেও ক্যাম্পাসের ভেতরে সহিংস দলীয় কার্যক্রম খুব কম দেখা যায়। এর ফলে তারা পড়াশোনা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বেশি মনোযোগ দিতে পারে। উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং জীবনমানের পেছনে এই স্থিতিশীল শিক্ষাব্যবস্থার বড় ভূমিকা রয়েছে।
এই বাস্তবতায় অনেকেই মনে করেন, ছাত্র রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলে শিক্ষার মান উন্নত হতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা রাজনীতির প্রভাবমুক্ত থেকে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারবে। তবে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাও সহজ বা সব ক্ষেত্রে কার্যকর নাও হতে পারে, কারণ এটি মৌলিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই বিকল্প হিসেবে একটি নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে—
ছাত্র রাজনীতি একেবারে অপ্রয়োজনীয় নয়, তবে এর বর্তমান চর্চা পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা—যেখানে শিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং শিক্ষার্থীরা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে—সেটিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। সরকারের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত উদ্যোগেই একটি সহিংসতামুক্ত, শিক্ষাবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের শিক্ষার্থীদের উপর—আর সেই ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।
সম্পাদক : মোহাম্মদ জিয়াউল হক, প্রকাশক : আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ
Contact : +8801822288799 (WhatsApp), E-mail : muktomonnews@gmail.com, Office : 56, A.H Tower (4th Floor), Sector-3, Road-2, Azampur, Uttara, Dhaka-1230.
© All rights reserved by Weekly MUKTOMON - 2024-25