মুক্তমন রিপোর্ট : রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত, টেকসই ও কার্যকর সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো ভূমিকা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে মিয়ানমারের ওপর সমন্বিত কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং মানবিক সহায়তায় জরুরি অর্থায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা।
নিউইয়র্ক স্থানীয় সময় সোমবার ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) কন্টাক্ট গ্রুপের রোহিঙ্গা বিষয়ক বৈঠকে দেওয়া বাংলাদেশের বিবৃতিতে এসব আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওআইসির অব্যাহত সংহতি ও সহযোগিতার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রায় এক দশক ধরে মানবিক কারণে বাংলাদেশ ১৩ লাখের বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নতুন করে আরও ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
এ ছাড়া প্রতিবছর রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। এর ফলে আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা মানবিক কার্যক্রমের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দীর্ঘায়িত বাস্তুচ্যুতির কারণে সমুদ্রপথে অবৈধ যাত্রা, মানবপাচার, মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে সংকটটি এখন বাংলাদেশের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জরুরি অর্থায়নের আহ্বান
রোহিঙ্গা ও স্থানীয় স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি ও টেকসই আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
বিবৃতিতে জানানো হয়, ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার (Joint Response Plan—JRP) আওতায় প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা ও স্থানীয় স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন।
২০২৫ সালের তুলনায় এ বছরের তহবিলের প্রয়োজন ২৬ শতাংশ কমানো হলেও এতে বাস্তবে প্রয়োজন কমে যাওয়ার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। বরং বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তার তহবিলে তীব্র সংকটের কারণে এ লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে বলে বিবৃতিতে বলা হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, এত বড় আর্থিক ও সামাজিক বোঝা একা বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে ওআইসি সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে টেকসই ও পর্যাপ্ত সহায়তা প্রয়োজন।
গাম্বিয়ার আইনি লড়াইয়ে ওআইসির সহায়তার প্রশংসা
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার পরিচালিত আইনি প্রক্রিয়ায় ওআইসির কূটনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতার প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ।
বিবৃতিতে জানানো হয়, এই আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সম্প্রতি ওআইসি রোহিঙ্গা তহবিলে আরও ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়েছে।
বাংলাদেশের তিন অগ্রাধিকার
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনটি অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমত, জাতিসংঘ ও আসিয়ানের (ASEAN) সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর সুসংহত কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার জন্য জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত অর্থ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সম্পদ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি স্বাগতিক—উভয় জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা আরও জোরদার করতে হবে।
তৃতীয়ত, গণহত্যা প্রতিরোধ এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতসহ (ICJ) অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার প্রতি ওআইসির সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে।
‘উদাসীন হওয়ার সুযোগ নেই’
বিবৃতির শেষাংশে বাংলাদেশ বলেছে, সময়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার বা মানবিক কারণে উদাসীন হয়ে পড়ার সুযোগ নেই।
রোহিঙ্গাদের শুধু সাময়িকভাবে টিকে থাকার সুযোগ করে দেওয়া নয়, বরং তাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।