আমি শুধু চাইনি এই মুহূর্তটা শেষ হোক’-মেসির শেষ বিদায়

Photo: Reuters
Photo: Reuters

ক্রীড়া প্রতিবেদক : দীর্ঘ ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টানলেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচটিও রাঙালেন গোল করে। বেনিনকে ৩-০ গোলে হারানোর পর যখন সতীর্থ, পরিবার ও সমর্থকদের ভালোবাসায় বিদায়ের মঞ্চে দাঁড়ালেন, তখন একটাই আক্ষেপ যেন বারবার ফিরে এলো তাঁর কণ্ঠে—ইচ্ছে করলে সারা জীবনই আর্জেন্টিনার হয়ে খেলে যেতে চাইতেন তিনি।

মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোরের ম্যাচটি তাই কেবল একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছিল না। ছিল একটি যুগের বিদায়। ফলাফলের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল আবেগ, স্মৃতি আর একজন কিংবদন্তিকে শেষবারের মতো দেশের জার্সিতে দেখার মুহূর্ত।

মেসির গোলের পাশাপাশি নিকো পাহ ও নিকোলাস ওতামেন্দির গোলে ৩-০ ব্যবধানের জয় পায় আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর শুরু হয় আসল বিদায়ের আয়োজন।

সকাল থেকেই উৎসব

মেসির শেষ ম্যাচকে ঘিরে সকাল থেকেই মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে ছিল উৎসবের আবহ। ম্যাচের অনেক আগেই দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া হয় গেট। একে একে মঞ্চে গান পরিবেশন করেন জনপ্রিয় শিল্পীরা। গ্যালারিতে জমতে থাকে হাজারো সমর্থক।

ম্যাচের আগে একাধিকবার আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায় মেসিকে। ম্যাচ শেষে বেনিন ও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা একে একে তাঁকে আলিঙ্গন করেন। আটবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই তারকার বিদায়ের মুহূর্তে সতীর্থদের চোখেও ছিল আবেগ।

এরপর শুরু হয় ড্রোন শো। আকাশে ফুটে ওঠে মেসির ১০ নম্বর জার্সি, বল পায়ে তাঁর ছুটে চলার দৃশ্য, বিশ্বকাপ হাতে উদযাপনের স্মৃতি—জাতীয় দলের হয়ে তাঁর দীর্ঘ পথচলার নানা মুহূর্ত।

পরিবারও ছিল তাঁর পাশে। স্ত্রী ও তিন ছেলে, সতীর্থরা—সবাই মিলে হয়ে ওঠে মেসির বিদায়ের শেষ মঞ্চের অংশ।

‘আমি চাই না এই মুহূর্তটা শেষ হোক’

এরপর মঞ্চে ওঠেন মেসি। শেষবারের মতো কথা বলেন নিজের দেশের সমর্থকদের সঙ্গে।

কথার মাঝে কখনও সতীর্থদের মুখে হাসি ফুটেছে, কখনও চোখ ভিজেছে। সবচেয়ে বেশি আবেগাপ্লুতদের একজন ছিলেন এন্সো ফের্নান্দেস।

মেসির কথাতেও বারবার ফিরে এসেছে আর্জেন্টিনার জার্সি।

“এই জার্সিকে ধন্যবাদ। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে, এমনকি সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তগুলোতেও আমি কখনও লড়াই করা থামাইনি, সামনে এগিয়ে যাওয়া বন্ধ করিনি, আমার যা কিছু ছিল তার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি এবং সবসময় এখানে থাকতে চেয়েছি।”

এরপরই উচ্চারণ করেন বিদায়ের সবচেয়ে আবেগঘন কথাগুলোর একটি—

“এখানে আর আসা এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে না খেলতে পারাটা আমাকে অনেক বেশি কষ্ট দেবে। যদি আমার হাতে থাকত, তাহলে আমি আমার সারা জীবন এখানে খেলে যেতে চাইতাম। কারণ আর্জেন্টিনার হয়ে খেলাটাই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার।”

বিদায়ের মুহূর্তটিকে যেন আর একটু দীর্ঘ করতে চাইছিলেন তিনি।

“আমার মনে হয়, আজ আমি অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছি, কারণ আমি স্রেফ চাই না যে এই মুহূর্তটি শেষ হয়ে যাক।”

কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবতাকে মেনে নিতেই হলো।

“আমার মনে হয়, এবার আমার অবসর নেওয়ার সময় চলে এসেছে।”

যে স্বপ্নের নাম বিশ্বকাপ

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অধ্যায় অবশ্যই ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। তবে তাঁর নিজের কথাতেই পরিষ্কার, সেই সাফল্য কোনো একক মুহূর্তের গল্প নয়। এর পেছনে ছিল বহু বছরের অপেক্ষা, হতাশা, ব্যর্থতা এবং অসংখ্য সতীর্থের লড়াই।

“২০২২ সালে, আমাদের কেবল আমার নিজের স্বপ্নই নয়, বরং পুরো একটি দেশের স্বপ্ন পূরণ করার আকাঙ্ক্ষা ছিল—আবারও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া। আর আমরা তা করে দেখিয়েছিলাম।”

বিশ্বকাপের পাশাপাশি কোপা আমেরিকা ও ফিনালিস্সিমার কথাও স্মরণ করেন তিনি।

“আমরা বিশ্বকাপ জিতেছি, কোপা আমেরিকা জিতেছি, ফিনালিস্সিমা জিতেছি… এই জাতীয় দলের সঙ্গে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, এর সবকিছুর জন্য আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ।”

তবে মেসি মনে করেন, তাঁর জাতীয় দলের গল্প শুধু ২০২২ সালের বিশ্বকাপ দিয়ে শুরু বা শেষ নয়।

“এই যাত্রাটা কেবল ২০২২ বা এই শেষ বিশ্বকাপকে নিয়ে নয়। আমরা শেষ পর্যন্ত বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনেক আগে থেকে অসংখ্য সতীর্থ এই জার্সির জন্য আমার পাশাপাশি লড়াই করেছে।”

‘আমার পাশে এমন সব যোদ্ধা ছিল’

জাতীয় দলের সতীর্থদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন মেসি। মাঠে তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোকে নিজের সৌভাগ্য হিসেবে দেখেছেন তিনি।

“আমার সব সতীর্থর সঙ্গে মাঠ ভাগাভাগি করতে পারা এবং ফুটবলের বাইরে আমাদের জীবনের এত বড় একটি অংশ এক সঙ্গে কাটাতে পারাটা ছিল একটি সৌভাগ্য ও সম্মানের।”

দলের শক্তির জায়গাটিও তুলে ধরেছেন তিনি।

“প্রতিবার যখন আমরা মাঠে পা রেখেছি, আমি জানতাম আমরা যে কোনো দলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারি। কারণ, আমার পাশে এমন সব যোদ্ধা ছিল যারা মাঠে তাদের সবটুকু দিতে প্রস্তুত ছিল।”

তাঁর মতে, বড় সাফল্যের জন্য যেমন শক্তিশালী দল দরকার, তেমনি কঠিন সময়েই দলের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায়।

“সবচেয়ে বড় অর্জনগুলো লুফে নিতে হলে আপনার একটি শক্তিশালী দলের প্রয়োজন। আর সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোতেই আপনি সত্যিই আবিষ্কার করতে পারবেন যে, আপনার দলটি কেমন।”

সমর্থকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের আবেগও। দেশের নানা শহরে খেলা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আর্জেন্টিনার ম্যাচে সমর্থকদের উপস্থিতির কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন তিনি।

“পৃথিবীর যেখানেই আমরা খেলি, স্টেডিয়ামগুলো সবসময় আর্জেন্টাইনদের দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল।”

সমর্থকদের প্রতি তাঁর আহ্বানও ছিল স্পষ্ট—কঠিন সময়েও জাতীয় দলের পাশে থাকতে হবে।

“কঠিন মুহূর্ত আসবে, আর সেই মুহূর্তগুলোতেই দলকে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি সমর্থন করতে হবে।”

কারণ, মেসির ভাষায়, জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখতে চাওয়া মানুষ সবসময় থাকবে। তাঁদের সেই সুযোগ দেওয়া যাবে না।

শেষ কথায় বাবার কথা

বিদায়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে জীবনের অন্যতম কঠিন মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে মেসির মনে পড়ে যায় তাঁর বাবার কথা।

“এই মুহূর্তে আমার ভেতর দিয়ে আবেগের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। আমি নিশ্চিতভাবেই এমন অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছি যা আমি বলতে চেয়েছিলাম, কারণ এটা আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন এক মুহূর্ত। সবার আগে যার কথা আমার মনে আসছে, তিনি হলেন আমার বাবা।”

এরপর মেসি বলেন—

“আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি এবং আমি একজন আর্জেন্টাইন হতে পেরে গর্বিত।”

সবশেষে আসে তাঁর বিদায়ের সারকথা—

“আমি কৃতজ্ঞতা, গর্ব ও শান্তি নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।”

বিদায়, কিন্তু সম্পর্কের নয়

বক্তব্য শেষ করে পুরো মাঠ ঘুরে সমর্থকদের অভিবাদনের জবাব দেন মেসি। এরপর আবার শুরু হয় গান। পরিবার ও সতীর্থদের সঙ্গে মাঠ ছাড়ার সময়ও স্টেডিয়ামজুড়ে চলতে থাকে সেই সুর।

জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর পথচলা থেমেছে। কিন্তু আর্জেন্টিনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হওয়ার নয়—মেসি নিজেই জানিয়ে গেছেন, তিনি ভবিষ্যতেও এই দল ও পরবর্তী প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সমর্থন করে যাবেন।

একটি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তাই তাঁর কথাগুলো যেন শুধু বিদায়ের ভাষণ নয়; আর্জেন্টিনার জার্সির সঙ্গে একজন ফুটবলারের আজীবন সম্পর্কের স্বীকারোক্তি।

মেসি হয়তো আর আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামবেন না। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে তাঁর নামটি যে চিরকাল মাঠে থাকবে—সেটিই এই বিদায়ের সবচেয়ে বড় সত্য।