আইয়ুব বাচ্চুর অপূর্ণ স্বপ্নের কনসার্ট

বাংলা ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু ও তাঁর গিটার
বাংলা ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু ও তাঁর গিটার

মুক্তমন রিপোর্ট : বাংলা ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর একটি স্বপ্ন ছিল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিশাল কনসার্ট আয়োজন করা। দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের নিয়ে সেই আয়োজনে একসঙ্গে মঞ্চে পারফর্ম করার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। তবে জীবদ্দশায় তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।

রোববার (১৮ অক্টোবর) আইয়ুব বাচ্চুর অষ্টম প্রয়াণ দিবস। ২০১৮ সালের এই দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে পরিবার ও সংগীতাঙ্গনের পক্ষ থেকে তাঁকে স্মরণ করার বিভিন্ন আয়োজনের কথা রয়েছে।

আইয়ুব বাচ্চু শুধু একজন জনপ্রিয় গায়কই ছিলেন না, গিটারবাদক হিসেবেও তাঁর ছিল অনন্য পরিচিতি। মঞ্চে তাঁর গিটার পরিবেশনা ও কণ্ঠের জাদু শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। নিজের সাফল্যের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অনেক সংগীতশিল্পীকেও তিনি অনুপ্রাণিত করেছেন।

এক সাক্ষাৎকারে নিজের স্বপ্নের কনসার্টের পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর কল্পনায় সেই আয়োজনের স্থান ছিল রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। সেখানে দেশি শিল্পীদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গিটারিস্ট স্টিভ ভাই, জো সাত্রিয়ানি ও কার্লোস সান্তানার মতো শিল্পীদের নিয়ে পারফর্ম করতে চেয়েছিলেন তিনি। দেশীয় শিল্পীদের মধ্যে জেমস, বেজবাবা সুমন ও মানাম আহমেদের নামও উল্লেখ করেছিলেন।

আইয়ুব বাচ্চুর পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় তিন ঘণ্টার সেই পরিবেশনা উপভোগ করবেন ১৫ লাখ দর্শক। তাঁর কাছে এটি ছিল স্বপ্নের কনসার্ট—যা বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি।

কনসার্টের পাশাপাশি সংগীতশিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্নও ছিল তাঁর। সেখানে শিশু-কিশোর ও তরুণেরা গিটারসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র শেখার সুযোগ পাবে, আর সেই শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই গড়ে উঠবে নতুন একক শিল্পী ও ব্যান্ড। বাংলা গানের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তৈরি করার এই পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি তিনি।

১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। ছোটবেলা থেকেই গিটারের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। ১৯৭৩ সালে বাবার কাছ থেকে গিটার পাওয়ার পর সংগীতচর্চায় আরও মনোযোগী হন তিনি। কলেজজীবনে বন্ধুদের সঙ্গে ‘গোল্ডেন বয়েজ’ ব্যান্ডে যুক্ত হন। পরে ১৯৭৭ সালে ‘ফিলিংস’ এবং ১৯৮০ সালে ‘সোলস’ ব্যান্ডে যোগ দেন।

১৯৯১ সালে নিজের ব্যান্ড ‘এলআরবি’ গঠন করেন আইয়ুব বাচ্চু। ব্যান্ডটি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নেয়। ‘সুখ’, ‘তবুও’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘অচেনা জীবন’ ও ‘যুদ্ধ’সহ বিভিন্ন অ্যালবাম শ্রোতাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়।

ব্যান্ড সংগীতের পাশাপাশি একক শিল্পী হিসেবেও সাফল্য পেয়েছেন তিনি। ‘রক্ত গোলাপ’, ‘ময়না’, ‘কষ্ট’, ‘সময়’ ও ‘একা’সহ একাধিক একক অ্যালবাম তাঁর সংগীতজীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। চলচ্চিত্রেও প্লেব্যাক করেছেন এই শিল্পী।

আইয়ুব বাচ্চুর প্রয়াণের পরও তাঁর গান ও গিটার পরিবেশনা শ্রোতাদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়। সংগীতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর জন্মশহর চট্টগ্রামের প্রবর্তক মোড়ে স্থাপন করা হয়েছে গিটার ভাস্কর্যও।

সংগীতের প্রতি ভালোবাসা, নতুনদের এগিয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং বিশাল কনসার্টের স্বপ্ন—এসবের মধ্য দিয়ে আইয়ুব বাচ্চু আজও ভক্ত ও সংগীতপ্রেমীদের স্মৃতিতে বেঁচে আছেন।

Muktomon/TA