মুক্তমন রিপোর্ট : কমপক্ষে ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার বিনিয়োগের বিনিময়ে বিদেশিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে আর্জেন্টিনা সরকার। শুক্রবার দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর সরকার ‘সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ নামে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেয়।
প্যারিসে অনুষ্ঠিত ‘আর্জেন্টিনা উইক’ উপলক্ষে কর্মসূচিটি ঘোষণা করা হয়। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিনিয়োগের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার নাগরিকত্ব বা পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য দুটি পদ্ধতি রাখা হয়েছে।
প্রথম পদ্ধতিতে আবেদনকারীকে আর্জেন্টিনার জাতীয় কোষাগারে ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার সরাসরি অনুদান দিতে হবে। এই অর্থ ফেরতযোগ্য নয়।
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে সরকার বিশেষভাবে এই কর্মসূচির জন্য যে ৮ লাখ ডলারের বন্ড তৈরি করবে, তাতে বিনিয়োগ করতে হবে।
পরিবারের সদস্যদেরও নাগরিকত্বের সুযোগ
কর্মসূচির আওতায় আবেদনকারীর স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানরাও নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রাপ্তবয়স্ক পরিবারের সদস্যদের জন্য কোষাগারে ১ লাখ ডলার এবং ১৮ বছরের কম বয়সী সন্তানের জন্য ২৫ হাজার ডলার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আর্জেন্টিনা সরকার জানিয়েছে, কর্মসূচির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ দেশের রাজস্ব ও আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করতে ব্যবহার করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, বিনিয়োগগুলো কঠোর যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। অর্থের উৎস ও লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় এই যাচাই করা হবে।
কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন
তবে নতুন এই কর্মসূচি কী ধরনের বিনিয়োগকারী আকর্ষণ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন বিশ্লেষক।
সরকারের সমালোচক অর্থনীতিবিদ পাবলো তিগানি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে মাদক পাচারকারী বা সন্দেহজনক উৎসের অর্থের মালিক ব্যক্তিরাও আর্জেন্টিনায় প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন, যাদের অন্য অনেক দেশে প্রবেশের অনুমতি নেই।
মিলেই চলতি সপ্তাহে প্যারিস সফর করে ওইসিডিতে আয়োজিত ‘আর্জেন্টিনা উইক’-এ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সফরে তিনি কয়েকটি বড় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও পেয়েছেন।
এর মধ্যে ফ্রান্সের টোটালএনার্জিস প্যাটাগোনিয়ায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সুইজারল্যান্ডের খনিশিল্প প্রতিষ্ঠান গ্লেনকোর একটি তামা প্রকল্পে ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আর্জেন্টিনা সরকারের ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ হিসেবে পরিচিত এই কর্মসূচি চলতি বছরের শেষ দিকে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগে পিছিয়ে আর্জেন্টিনা
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) জানিয়েছে, গত বছর আর্জেন্টিনা ৩ দশমিক ১৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ পেয়েছে। একই সময়ে ব্রাজিল পেয়েছে ৭৬ দশমিক ৮৭৭ বিলিয়ন ডলার এবং মেক্সিকো পেয়েছে ৪০ দশমিক ৮৭১ বিলিয়ন ডলার।
মিলেই সরকার সরকারি ব্যয় কমানো, অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা এবং বাণিজ্যিক বাধা কমানোর মাধ্যমে আর্জেন্টিনাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদ মার্সেলো এলিসোন্দোর মতে, বিনিয়োগকারীরা এখনো অপেক্ষা করছেন—আর্জেন্টিনার অস্থির অর্থনীতিতে সরকারের সংস্কারগুলো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় কি না, তা দেখার জন্য।
কৃষিজমি কেনার বিধিনিষেধ নিয়েও বিতর্ক
নতুন নাগরিকত্ব কর্মসূচির ঘোষণার কয়েক দিন আগে আর্জেন্টিনার সুপ্রিম কোর্ট বিদেশিদের কৃষিজমি কেনার ওপর থাকা একটি সীমাবদ্ধতা বাতিল করেছে।
মঙ্গলবার আদালত মিলেই সরকারের ২০২৩ সালের একটি ডিক্রি বহাল রাখে। ওই ডিক্রির মাধ্যমে ২০১১ সাল থেকে বিদেশিদের কৃষিজমির মালিকানায় থাকা ১৫ শতাংশ সীমা বাতিল করা হয়েছিল।
তবে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ—আর্জেন্টিনায় ‘লাস মালভিনাস’ নামে পরিচিত—নিয়ে ১৯৮২ সালের যুদ্ধে অংশ নেওয়া সাবেক সেনাসদস্যরা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তাঁরা মিলেই সরকারের বিরুদ্ধে দেশটির সম্পদ বিক্রির সুযোগ তৈরি করার অভিযোগ তুলেছেন।
আইন পরিবর্তনের প্রতিবাদে আগামী সপ্তাহে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলও পার্লামেন্টে এই পরিবর্তন ঠেকানোর চেষ্টা করবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।