একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবনসংগ্রামের গল্প

শামসু কাকা: বহুমুখী প্রতিভা, নিরন্তর সংগ্রাম আর এক জীবনের গল্প

শামসু কাকা: বহুমুখী প্রতিভা, নিরন্তর সংগ্রাম আর এক জীবনের গল্প

যুবরাজ ফয়সাল : 

কিছু মানুষের জীবন উপন্যাসের মতো, অথচ তাঁদের নিয়ে কোনো উপন্যাস লেখা হয় না। তাঁদের জীবনে থাকে না বড় কোনো প্রাপ্তির গল্প, থাকে না সাফল্যের জাঁকজমক। থাকে শুধু বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াই, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা আর নিজের ইচ্ছেগুলোকে বিসর্জন দিয়ে সামনে এগিয়ে চলা। তাঁরা জীবনভর অন্যের জন্য বাঁচেন, অথচ নিজেদের জীবনে কতটা সুখী হতে পেরেছেন, সেই হিসাবটা আর কখনো মেলানো হয় না।

মোঃ শামশুদ্দিন, আমাদের শামসু কাকা, ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।

৬৮ বছর বয়সে আজ তিনি চলে গেলেন। তাঁর জীবনের দীর্ঘ পথচলার শেষ ঠিকানাটিও যেন এক অদ্ভুত বৃত্ত সম্পন্ন করল—রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। যে হাসপাতাল ছিল তাঁর কর্মজীবনের পরিচিত ঠিকানা, সেখানেই থেমে গেল তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়।

একজন মানুষের মৃত্যু কেবল তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতি নয়; কখনো কখনো তা আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় তাঁর গোটা জীবনকে নতুন করে দেখার প্রশ্ন। শামসু কাকার মৃত্যুসংবাদ আমাকে তেমনই কিছু ভাবনার সামনে দাঁড় করিয়েছে। মনে হচ্ছে, মানুষটি চলে গেলেন, অথচ তাঁর জীবনসংগ্রামের গল্পটি যেন আরও একবার বলা দরকার।

কারণ, শামসু কাকার জীবন ছিল এমন এক গল্প, যেখানে নায়ক ছিলেন তিনি নিজেই, কিন্তু নিজের সুখের জন্য তাঁর হাতে সময় ছিল খুব সামান্য।

জীবিকার জন্য এক জীবনের ছুটে চলা

শামসু কাকা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাকরি করতেন। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা সব সময় চাকরির নির্দিষ্ট বেতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সংসার বড় হয়, চাহিদা বাড়ে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ সামনে এসে দাঁড়ায়। তখন একজন মানুষের ব্যক্তিগত সময়, বিশ্রাম কিংবা শখের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে পরিবারের প্রয়োজন।

কাকাও সেই বাস্তবতার বাইরে ছিলেন না।

হাসপাতালে চাকরির পাশাপাশি তিনি ফটোগ্রাফির কাজ করতেন। মানুষের ছবি তুলতেন। কারও জন্মদিন, কারও বিয়ে কিংবা জীবনের বিশেষ কোনো মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরে রাখতেন। অন্যের স্মৃতিকে ছবির ফ্রেমে বন্দি করে রাখতেন তিনি, যাতে মানুষ বহু বছর পরেও ফিরে যেতে পারে তার আনন্দের দিনগুলোতে।

শুধু তা-ই নয়, জন্মদিন, মুসলমানি কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানে বাসরঘর সাজানোর কাজও করতেন। অন্যের জীবনের আনন্দকে সুন্দর করে তুলতে নিজের শ্রম ব্যয় করতেন।

ভাবতে অবাক লাগে, একজন মানুষকে সংসারের দায়িত্ব সামলাতে কত রকমের কাজই না করতে হয়! একটি চাকরি, তার পাশাপাশি ফটোগ্রাফি, আবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাজসজ্জার কাজ। কাজের ধরন আলাদা, কিন্তু উদ্দেশ্য একটাই—সংসারটাকে টিকিয়ে রাখা, সন্তানদের মানুষ করা, পরিবারের প্রয়োজন মেটানো।

হয়তো প্রতিটি কাজের শেষে তাঁর হাতে কিছু টাকা আসত। সেই টাকা দিয়ে মিটত সংসারের কোনো প্রয়োজন, পূরণ হতো সন্তানের কোনো আবদার, কিংবা সামলানো যেত জীবনের কোনো জরুরি হিসাব।

কিন্তু সেই হিসাবের বাইরে কাকার নিজের জন্য কী থাকত?

প্রশ্নটা আজ খুব সাধারণ মনে হলেও এর উত্তর মোটেও সহজ নয়।

চাকরির পরেও থামেনি সংগ্রাম

হাসপাতালের চাকরির পর জীবিকার প্রয়োজনে রাজশাহীর রাজ্জাকের মোড়ে একটি ছোট্ট চায়ের টং দোকান দিয়েছিলেন তিনি।

জীবনের এই অধ্যায়টি ভাবলে একজন মানুষের সংগ্রামের গভীরতা অনুভব করা যায়। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় চাকরি করেছেন, পাশাপাশি ফটোগ্রাফির কাজ করেছেন, অনুষ্ঠানে বাসরঘর সাজিয়েছেন। তারপর জীবনের প্রয়োজনে চায়ের দোকানও সামলেছেন।

জীবন যেন তাঁকে বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে, শুধু একটি কাজ করে থেমে থাকার সুযোগ তাঁর নেই।

হয়তো রাজ্জাকের মোড়ের সেই ছোট্ট দোকানে বসে তিনি কত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। কত পরিচিত মুখ এসেছে, চা খেয়েছে, গল্প করেছে, আবার চলে গেছে। কেউ হয়তো তাঁর জীবনের গল্প জানতে চায়নি। কেউ হয়তো ভাবেনি, এই সাধারণ চায়ের দোকানের মানুষটির পেছনে কত বছরের পরিশ্রম, কত দায়িত্ব আর কত অপূর্ণতার ইতিহাস জমে আছে।

আমরা সাধারণত মানুষের বর্তমান অবস্থান দেখি, কিন্তু সেই অবস্থানে পৌঁছানোর জন্য তাঁকে কতটা পথ হাঁটতে হয়েছে, কতবার নিজের ইচ্ছাকে পেছনে ফেলতে হয়েছে, তা দেখি না।

শামসু কাকার জীবনও হয়তো তেমনই ছিল।

তাঁর সংগ্রাম নিয়ে কোনো বড় আলোচনা হয়নি, তাঁর পরিশ্রমের স্বীকৃতি নিয়ে কোথাও বিশেষ আয়োজন হয়নি। অথচ সংসারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি যে শ্রম দিয়েছেন, তার মূল্য কোনো পদবি কিংবা অর্থের অঙ্ক দিয়ে পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায় না।

সংসারের টানাপোড়েনেও ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা

জীবনের এত ব্যস্ততা, এত দায়িত্ব আর আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেও শামসু কাকার একটা আলাদা জগৎ ছিল—ক্রিকেটের জগৎ।

তিনি ক্রিকেট ভালোবাসতেন। খেলাধুলার প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ক্রিকেটারদের উৎসাহিত করতেন, পাড়ামহল্লায় বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা ও ইভেন্ট আয়োজন করতেন।

এখানেই শামসু কাকাকে অন্যভাবে আবিষ্কার করা যায়।

যে মানুষটি সংসারের প্রয়োজন মেটাতে একের পর এক কাজ করেছেন, তিনিও নিজের ভালো লাগার জায়গাটিকে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে দেননি। জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও ক্রিকেটের প্রতি তাঁর টান ছিল।

হয়তো খেলার মাঠে, কোনো আয়োজনে কিংবা পরিচিত মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্যে তিনি খুঁজে পেতেন নিজের আনন্দের কিছু মুহূর্ত। হয়তো সেসব মুহূর্ত তাঁকে সাময়িকভাবে ভুলিয়ে দিত জীবনের হিসাব-নিকাশ, সংসারের দুশ্চিন্তা আর প্রতিদিনের ক্লান্তি।

আমরা জানি না, তাঁর জীবনের আনন্দের মুহূর্তগুলো ঠিক কতটা দীর্ঘ ছিল। কিন্তু এটুকু বোঝা যায়, প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি এমন কিছু ভালোবাসাকে আঁকড়ে রেখেছিলেন, যা তাঁর জীবনকে শুধু জীবিকা অর্জনের গল্পে সীমাবদ্ধ থাকতে দেয়নি।

এমন মানুষের জীবনেই হয়তো সবচেয়ে বেশি বৈপরীত্য থাকে। একদিকে কঠিন বাস্তবতা, অন্যদিকে নিজের পছন্দের জগতের প্রতি গভীর টান। একদিকে সংসারের দায়িত্ব, অন্যদিকে ক্রিকেটের মাঠে কিছুটা আনন্দ খুঁজে নেওয়া।

এই বৈপরীত্যই একজন মানুষকে রক্ত-মাংসের মানুষ করে তোলে। তাঁকে কেবল পরিবারের উপার্জনকারী হিসেবে নয়, তাঁর নিজস্ব ভালো লাগা, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাসহ দেখতে শেখায়।

পানের রঙে কালচে দাঁত, স্মৃতিতে এক চেনা মুখ

শামসু কাকা প্রচণ্ড পান খেতেন। তাঁর দাঁতগুলো প্রায়ই কালচে হয়ে থাকত। কথাটা খুব সাধারণ, কিন্তু মৃত্যুর পর এমন ছোট ছোট বৈশিষ্ট্যই কখনো কখনো মানুষের স্মৃতিতে সবচেয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

মানুষ চলে যাওয়ার পর তার বড় বড় পরিচয়গুলো হয়তো একসময় ঝাপসা হয়ে যায়। কিন্তু তার হাঁটাচলা, কথা বলার ধরন, পরিচিত অভ্যাস কিংবা মুখের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য স্মৃতির মধ্যে অদ্ভুতভাবে টিকে থাকে।

হয়তো একদিন কোথাও কাউকে পান খেতে দেখলে শামসু কাকার কথা মনে পড়বে। রাজ্জাকের মোড়ের কোনো চায়ের দোকান দেখলে মনে পড়বে তাঁর ছোট্ট দোকানটির কথা। কোনো পুরোনো ক্যামেরা কিংবা ক্রিকেটের মাঠ দেখলেও মনে পড়তে পারে সেই মানুষটিকে, যিনি জীবিকার জন্য এত কিছু করেও নিজের পছন্দের জগৎটুকু ভালোবেসেছিলেন।

মৃত্যু মানুষকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু স্মৃতির কাছে তার পরিচিত চেহারাটি থেকে যায়।

শামসু কাকার ক্ষেত্রেও হয়তো এমনটাই হবে। তাঁর সম্পর্কে মনে পড়বে না শুধু তাঁর মৃত্যুর কথা; মনে পড়বে তাঁর জীবনের অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্ত।

আর এই ছোট ছোট মুহূর্তের সমষ্টিই তো একজন মানুষ।

একজন বাবা, যাঁর নিজের সুখের হিসাব অজানাই রয়ে গেল

শামসু কাকার জীবন নিয়ে ভাবতে গিয়ে বারবার একটি প্রশ্ন ফিরে আসে—সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে, সংসারের টানাপোড়েন সামলাতে গিয়ে, জীবিকার প্রয়োজনে একের পর এক কাজ করে যেতে যেতে তিনি কি কখনো নিজের সুখের জন্য সময় পেয়েছিলেন?

একজন বাবার জীবন অনেক সময় এমনই হয়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ তাঁর বর্তমানকে গ্রাস করে ফেলে। পরিবারের প্রয়োজন তাঁর নিজের ইচ্ছার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। সন্তানদের মুখে হাসি দেখার জন্য তিনি নিজের ক্লান্তিকে উপেক্ষা করেন। সংসারে স্বস্তি ফেরানোর জন্য নিজের বিশ্রামটুকুও বিসর্জন দেন।

একসময় এই ছুটে চলাটাই তাঁর জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু এই নিরন্তর ছুটে চলার মধ্যে মানুষটি নিজে কোথায় থাকেন?

সন্তানদের বড় করতে গিয়ে একজন বাবা হয়তো নিজের অনেক স্বপ্নের কথা ভুলে যান। নিজের পছন্দের জীবন কেমন হতে পারত, তা নিয়ে ভাবার অবকাশও পান না। প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটাতে মেটাতে কখন যে জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়, তা বুঝে ওঠার আগেই এসে যায় বার্ধক্য।

তারপর একদিন জীবন থেমে যায়।

পেছনে পড়ে থাকে কিছু স্মৃতি, কিছু অর্জন, কিছু অপূর্ণতা আর এমন কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর আর কখনো জানা হয় না।

শামসু কাকার জীবনও কি তেমনই ছিল?

তিনি কি কখনো ভেবেছিলেন, একদিন আর তাঁকে কাজ করতে হবে না, সংসারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য ছুটতে হবে না? জীবনের কোনো এক বিকেলে নিশ্চিন্তে বসে নিজের পছন্দের খেলাটি দেখবেন, প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সময় কাটাবেন, কিংবা নিজের জন্য একটু স্বস্তির জীবন খুঁজে নেবেন?

হয়তো ভেবেছিলেন। হয়তো ভাবারও সুযোগ পাননি।

আমরা তাঁর মনের সব কথা জানি না। তাই তাঁর জীবনকে শুধু আক্ষেপের গল্প হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। কারণ, যে মানুষটি এত পরিশ্রম করেছেন, তাঁর জীবনে নিশ্চয়ই কিছু আনন্দও ছিল, কিছু প্রাপ্তিও ছিল, কিছু তৃপ্তির মুহূর্তও ছিল।

তবু তাঁর জীবন আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়—পরিবারের জন্য সবটুকু দিয়ে দেওয়া মানুষটির নিজের জন্য কতটুকু অবশিষ্ট থাকে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু শামসু কাকার জন্য নয়। আমাদের সমাজের অসংখ্য বাবার জীবনেই হয়তো এর প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

মৃত্যুর পর মানুষটির জীবনের হিসাব

আজ শামসু কাকা নেই। যে মানুষটি জীবিকার প্রয়োজনে একসময় হাসপাতাল, ফটোগ্রাফি, অনুষ্ঠানের সাজসজ্জা আর চায়ের দোকান সামলেছেন, তাঁকে আর কোনো নতুন কাজের সন্ধানে বের হতে হবে না।

আর কোনো দিন রাজ্জাকের মোড়ের সেই ছোট্ট দোকানে বসতে হবে না। আর কোনো অনুষ্ঠানে বাসরঘর সাজানোর ব্যস্ততা থাকবে না। ক্যামেরায় অন্যের জীবনের আনন্দের মুহূর্ত ধরে রাখারও প্রয়োজন হবে না।

জীবনের সব ব্যস্ততা শেষ হয়েছে।

কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষের জীবনের হিসাব কি সত্যিই শেষ হয়ে যায়?

আমার মনে হয়, না।

কারণ, একজন মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাঁর শ্রমের ফল থেকে যায়। তাঁর সন্তানদের জীবনে, পরিবারের স্মৃতিতে, পরিচিত মানুষের মনে এবং তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ছোট ছোট গল্পে তিনি বেঁচে থাকেন।

শামসু কাকার জীবন হয়তো প্রাচুর্যের গল্প নয়, কিন্তু এটি পরিশ্রমের গল্প। এটি দায়িত্বের গল্প। প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার গল্প। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে পরিবারকে আগলে রাখার গল্প।

তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সব সংগ্রামের দৃশ্যমান পুরস্কার থাকে না। সব পরিশ্রমের স্বীকৃতি মেলে না। সব মানুষের জীবনে নিজের জন্য বাঁচার সুযোগও আসে না।

তবু তাঁরা বেঁচে থাকেন, কাজ করেন, দায়িত্ব পালন করেন। কারণ, তাঁদের কাছে জীবন মানে শুধু নিজের জন্য বেঁচে থাকা নয়; প্রিয় মানুষদের জন্যও বেঁচে থাকা।

শামসু কাকার জীবনসংগ্রামের মূল্য সেখানেই।

শেষ প্রশ্নটি থেকেই যায়

আজ তাঁর চলে যাওয়ার পর মনে হচ্ছে, মানুষটি সারাজীবন ছুটলেন। এক কাজ থেকে অন্য কাজে, এক দায়িত্ব থেকে আরেক দায়িত্বে। সংসারের প্রয়োজনে, সন্তানদের মানুষ করার তাগিদে, জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে পার করে দিলেন ৬৮টি বছর।

কিন্তু এই দীর্ঘ ছুটে চলার শেষে তিনি কি নিজের সুখের ঠিকানাটি খুঁজে পেয়েছিলেন?

আমরা জানি না।

হয়তো জীবনের কিছু প্রাপ্তি তাঁকে আনন্দ দিয়েছে। হয়তো সন্তানদের বেড়ে ওঠা, পরিবারের কোনো সুখের মুহূর্ত কিংবা ক্রিকেটের মাঠে কোনো আয়োজন তাঁকে তৃপ্ত করেছে। আবার হয়তো কিছু অপূর্ণতা নীরবে রয়ে গেছে তাঁর ভেতরেও।

এই উত্তরগুলো এখন আর তাঁর কাছ থেকে জানা সম্ভব নয়।

আর এটাই মৃত্যুর সবচেয়ে গভীর বেদনার একটি—মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার জীবনের অনেক অজানা অধ্যায় চিরকালের জন্য অজানাই থেকে যায়।

শামসু কাকা, আপনার জীবনের গল্পটি হয়তো খুব বড় কোনো মঞ্চে বলা হবে না। আপনার নামে হয়তো কোথাও স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হবে না। কিন্তু আপনার মতো মানুষের জীবনই আমাদের শেখায়, একজন সাধারণ মানুষও অসাধারণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি জীবন পার করে দিতে পারেন।

আপনি অন্যের জীবনের আনন্দের মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় ধরে রেখেছেন, অন্যের আনন্দের জন্য বাসরঘর সাজিয়েছেন, সংসারের জন্য চায়ের দোকানে বসেছেন, আর নিজের ভালোবাসার জায়গা ক্রিকেটকে আঁকড়ে থেকেছেন।

এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে আপনি আপনার মতো করে জীবনকে বহন করেছেন।

আজ আপনার সেই পথচলা শেষ।

কিন্তু আপনার জীবন নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমাদের মনে যে প্রশ্নটি থেকে গেল, তার উত্তর হয়তো কোনো দিনই পাওয়া যাবে না।

যে মানুষটি সারাজীবন পরিবারের সুখের জন্য ছুটলেন, তিনি নিজে কি কখনো মন খুলে সুখী হতে পেরেছিলেন?

হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর আপনার সঙ্গে সঙ্গেই চিরতরে হারিয়ে গেল।

বিদায়, শামসু কাকা।

আপনার জীবনের সব ক্লান্তি, সব দায়িত্ব আর সব ছুটে চলার অবসান হোক। পরপারে শান্তিতে থাকুন।

আপনার জীবনসংগ্রামের গল্প বেঁচে থাকুক আমাদের স্মৃতিতে।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন..