বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আস্থার সংকট : রাষ্ট্রদূত মুশফিক

 ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে আলোচনা সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী
ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে আলোচনা সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী

মুক্তমন রিপোর্ট : বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হলে এ দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা বুঝতে হবে ভারতকে। একই সঙ্গে নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে দিল্লিকে আরও সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী।

তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাঁকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ কঠিন করে তুলছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় অতিথি বক্তা হিসেবে এসব কথা বলেন মুশফিকুল ফজল আনসারী। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতি, পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে আয়োজিত এ সভায় আসাঙ্গা আবেয়াগোনাসেকারার লেখা উইন্ডস অব চেঞ্জ: জিওপলিটিক্স অ্যাট দ্য ক্রসরোডস অব সাউথ অ্যান্ড সাউথইস্ট এশিয়া বই নিয়ে আলোচনা হয়।

মুশফিকুল ফজল আনসারী বলেন, বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা বোঝার ক্ষেত্রেও ভারতকে আরও সচেষ্ট হতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব কোনো নির্দিষ্ট নেতা বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি দেশের জনগণের সঙ্গে গড়ে তুলতে হয়।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জবাবদিহিমূলক সরকারের প্রত্যাশা প্রকাশ পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এসব আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশের প্রতি চীনের সহযোগিতামূলক মনোভাবকে স্বাগত জানিয়ে আনসারী বলেন, উন্নয়ন ও মানুষের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টিতে এ অংশীদারত্ব কাজে লাগানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভারত ও চীন—উভয় দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব সম্প্রসারণের পক্ষে মত দেন তিনি।

তবে এ বন্ধুত্ব সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের ভিত্তিতে হওয়া উচিত বলে উল্লেখ করেন আনসারী। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আলোচনায় আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ অঞ্চলে রাশিয়ার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি সম্পর্ক এবং পাকিস্তান ও নেপালের জ্বালানি খাতে দেশটির সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরেন তিনি।

কুগেলম্যান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসার পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো এবং ভারত থেকে দূরে সরে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের অবস্থানকে সরলভাবে কোনো একটি দেশের শিবিরে যোগ দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং এসব দেশ চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তনও এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দ্য মিলেনিয়াম প্রজেক্টের নির্বাহী পরিচালক জেরোম সি. গ্লেন বিশ্বরাজনীতিতে ‘জিরো-সাম’ প্রতিযোগিতার ধারণার সমালোচনা করেন। এ ধারণায় এক পক্ষের লাভকে অন্য পক্ষের ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়।

গ্লেনের মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সম্মিলিত সুফল সৃষ্টির লক্ষ্যে সহযোগিতার পথ খুঁজতে হবে। প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেন তিনি।

বইটির লেখক আসাঙ্গা আবেয়াগোনাসেকারা বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভবিষ্যৎ পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ক্রমেই ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে।

তিনি প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে আস্থার ঘাটতি এবং বড় শক্তিগুলোর প্রভাব ছোট রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে কীভাবে প্রভাবিত করে তা পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেন।

আসাঙ্গার মতে, আঞ্চলিক সহযোগিতা, দূরদর্শিতা ও আগাম প্রস্তুতিমূলক কূটনীতি আরও জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে ছোট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারে।

অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন মাইকেল কুগেলম্যান ও জেরোম সি. গ্লেন। গ্লোবাল ফোরসাইট স্ট্র্যাটেজিসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী প্যাটি মরিস আলোচনা সঞ্চালনা করেন। এ ছাড়া সাংবাদিক, কূটনীতিক ও বিশিষ্ট অতিথিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

Muktomon/TA