ক্রীড়া ডেস্ক : চাওয়া-পাওয়ার হিসাব পূর্ণ হয়েছে অনেক আগেই। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা—একটির পর একটি শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায়গুলোর অংশ হয়েছেন লিওনেল মেসি। বাকি ছিল শুধু প্রিয় সমর্থকদের সামনে জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামা। সেই বিদায়ের রাতটাও নিজের মতো করেই রাঙালেন ফুটবলের মহাতারকা—গোল করলেন, গোল করালেন এবং দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে মাঠ ছাড়লেন বিজয়ীর বেশে।
বুয়েন্স আইরেসের স্তাদিও মনুমেন্তালে বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোরে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। দলের প্রথম দুই গোলে সরাসরি অবদান রাখার পর তৃতীয় গোলটি নিজেই করেন মেসি।
তবে ম্যাচের ফলের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল রাতটির আবেগ। কারণ, আকাশি-সাদা জার্সিতে এটাই ছিল মেসির শেষ ম্যাচ।
শুরু থেকেই আবেগের আবহ
ম্যাচ শুরুর আগে সতীর্থদের সঙ্গে শেষবারের মতো ওয়ার্মআপে নামেন মেসি। এরই মধ্যে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় গ্যালারি। চারদিক থেকে ভেসে আসতে থাকে উল্লাস। কারও হাতে মেসির ছবি, কারও হাতে তাঁকে নিয়ে লেখা প্ল্যাকার্ড।
মাঠে মেলে ধরা হয় বিশাল আকৃতির মেসি লেখা জার্সি। আতশবাজির আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম। জাতীয় সংগীতের সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি কোচ লিওনেল স্কালোনি। তাঁর দুই গাল বেয়ে নেমে আসে অশ্রু। শুরুতে মেসিকে কিছুটা নির্লিপ্ত দেখালেও একপর্যায়ে তাঁর চোখও অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।
এরপর শুরু হয় ফুটবলের লড়াই। দেশের জার্সিতে শেষবারের মতো বল পায়ে ছুটতে থাকেন মেসি।
সপ্তম মিনিটেই গোলের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। দূর থেকে বাঁ পায়ের দারুণ শট নিয়েছিলেন, কিন্তু বেনিনের গোলরক্ষক ঝাঁপিয়ে পড়ে তা ঠেকিয়ে দেন।
১০ মিনিটে আবার থেমে যায় খেলা। মেসির ১০ নম্বর জার্সিকে সম্মান জানাতে আতশবাজিতে মুখরিত হয় স্টেডিয়াম। দুই দলের খেলোয়াড়, কোচ এবং হাজারো দর্শক হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানান আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিকে।
ওতামেন্দির গোলে এগিয়ে আর্জেন্টিনা
ফিফা র্যাঙ্কিং ও শক্তির বিচারে দুই দলের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকলেও শুরুতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলতে থাকে বেনিন। ১৮তম মিনিটে ভালো একটি সুযোগও পেয়েছিল তারা। তবে বিপজ্জনক জায়গা থেকে জুনিয়র ওলাইতানের নেওয়া শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
২৩তম মিনিটে ডান দিক থেকে ছয় গজ বক্সের মুখে ক্রস বাড়ান রদ্রিগো দে পল। স্লাইড করে কোনোমতে বলে পা ছোঁয়াতে পারলেও মেসির সেই প্রচেষ্টা লক্ষ্যে থাকেনি।
দুই মিনিট পর ডি-বক্সের বেশ দূর থেকে ফ্রি-কিক পায় আর্জেন্টিনা। সরাসরি শট নেন মেসি। বল লক্ষ্যে থাকলেও তা আটকে দেন বেনিনের গোলরক্ষক।
বিরতির আগে বেনিনও ভয় ধরিয়ে দেয় আর্জেন্টিনার রক্ষণে। তামিমুর কোনাকুনি শট দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্তিনেস।
দ্বিতীয়ার্ধের তৃতীয় মিনিটেই অবশেষে গোলের দেখা পায় আর্জেন্টিনা। মেসির নেওয়া কর্নার থেকে উড়ে আসা বল ছয় গজ বক্সের সামনে লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত ভলিতে জালে পাঠান নিকোলাস ওতামেন্দি।
জাতীয় দল থেকে আগেই অবসরের ঘোষণা দেওয়া ওতামেন্দির জন্যও ম্যাচটি ছিল বিদায়ের উপলক্ষ। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ঘরের মাঠে তাঁকেও বিদায় জানানোর সুযোগ করে দেয়। সেই রাতেই গোল করে বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখেন ৩৮ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার।
৬১তম মিনিটে আবারও মেসির জাদু। তাঁর বাড়ানো পাস থেকে দারুণ গোল করে আর্জেন্টিনার ব্যবধান দ্বিগুণ করেন নিকো পাহ। এরপর ম্যাচের ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে যায়।
শেষ ম্যাচে মেসির গোল
তবে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের অপেক্ষা ছিল আরও একটি মুহূর্তের জন্য—জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির পায়ে আরেকটি গোল দেখার।
সেই অপেক্ষাও শেষ হয় ৭১তম মিনিটে।
আগুস্তিন জিয়াই ডি-বক্সে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। স্পট কিক নিতে এগিয়ে আসেন মেসি। জোরালো শটে বল জালে পাঠিয়ে এরপর ধীরে ধীরে দর্শকদের দিকে এগিয়ে যান তিনি।
চোখে-মুখে ছিল না বাড়তি উচ্ছ্বাস। কিন্তু তাঁকে ঘিরে সতীর্থদের উল্লাস বলে দিচ্ছিল মুহূর্তটির মাহাত্ম্য।
এরপরও গোলের সুযোগ এসেছিল মেসির সামনে। ছয় গজ বক্সের বাইরে ফাঁকায় বল পেয়েও অবিশ্বাস্যভাবে বাইরে মেরে বসেন তিনি। শেষ সময়ে আরও একটি ফ্রি-কিক পেয়েছিলেন। তবে তাঁর নেওয়া শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়।
এরপরই শেষ বাঁশি।
থেমে যায় আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির পথচলা।
অনন্য এক অধ্যায়ের সমাপ্তি
আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির ক্যারিয়ারের শেষটাও এসেছে তাঁর ক্যারিয়ারের মতোই বর্ণিল এক অধ্যায়ের পর।
কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ, আবার কোপা আমেরিকা—শিরোপার অনন্য এক চক্র পূর্ণ করে জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন তিনি।
আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল ও ৬৯টি অ্যাসিস্ট নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অধ্যায় শেষ হলো মেসির।
বিদায়ের রাতে তিনি শুধু একটি গোল করেননি; বরং নিজের শেষ ম্যাচটিতেও দেখিয়ে গেলেন কেন এত বছর ধরে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সির সবচেয়ে বড় আশ্রয়ের নাম ছিল লিওনেল মেসি।
একজন কিংবদন্তির শেষটা এর চেয়ে সুন্দর আর কীভাবেই বা হতে পারত!