মুক্তমন রিপোর্ট : মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করাই সরকারের অঙ্গীকার বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি সরকারের লক্ষ্য নন; সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করাই সরকারের উদ্দেশ্য।
বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালামসহ সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সরকারের কাছে পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে। তার দাবি, প্রমাণগুলো এতটাই শক্তিশালী যে বিশ্বের যেকোনো ট্রাইব্যুনাল ‘যুক্তিসংগত সন্দেহের ঊর্ধ্বে’ গিয়ে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে।
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতি হিসেবে ‘যুক্তিসংগত সন্দেহের ঊর্ধ্বে’ অপরাধ প্রমাণের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও একই নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধান শুধু আইনজ্ঞদের আলোচনার বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষও সংবিধানের বিভিন্ন ধারা, সংশোধনী, নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।
তার মতে, এ ধরনের আলোচনা মানুষের সাংবিধানিক সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে নাগরিকরা নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন হচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের কিছু সাদৃশ্যের কথাও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্ট যে এখতিয়ার প্রয়োগ করে, তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর কিছু মিল রয়েছে।
তবে এই এখতিয়ার কখনো কখনো অপব্যবহার বা ভুলভাবে প্রয়োগ করা হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবিধান প্রণয়নে রাজনৈতিক দর্শনের প্রভাবের প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী জন লক, থমাস হবস ও মন্টেস্কুর চিন্তাধারার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণেতারা এসব দার্শনিকের তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নেও এসব রাজনৈতিক দর্শনের প্রভাব রয়েছে।
আইনমন্ত্রীর ভাষ্য, ১৭৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণেতারা যে তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময়ও তার অনেকটাই অনুসরণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারের কিছু নীতিগত অবস্থানের প্রশংসা করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক বন্ধ এবং সংগঠন ও সমাবেশের স্বাধীনতার মতো কিছু মৌলিক মূল্যবোধ ও নীতির ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
তার দাবি, এসব মূল্যবোধ বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য লড়াইকে উৎসাহিত করেছে।
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী দাবি করেন, আগের শাসনামলে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য লড়াই করা ৪ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। প্রায় ৭০০ মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
এ ছাড়া বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত ৬০ লাখের বেশি মানুষ রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে করা মামলার প্রায় ৯৯ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
বর্তমান সরকারের সময়ে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, গত ছয় মাসের বেশি সময়ে এ ধরনের ঘটনা প্রায় শূন্যের পর্যায়ে রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পুলিশ মিথ্যা মামলা করেছে—এমন কোনো অভিযোগ বর্তমান সময়ে পাওয়া যায়নি বলেও তিনি জানান।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশে আরও শক্তিশালী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন আইনে নির্যাতনবিরোধী জাতিসংঘের ঐচ্ছিক প্রটোকল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মানবাধিকার কমিশনের নির্বাচন কমিটির কাঠামো তুলে ধরে তিনি বলেন, এতে প্রেসক্লাব ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতিতে উচ্চমানের স্বীকৃতি থাকলেও তাদের নির্বাচন কমিটির নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত কাঠামোয় নির্বাচন কমিটির নেতৃত্ব স্পিকারের হাতে রাখা হয়েছে এবং বিরোধীদলীয় নেতাকেও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার সাংবিধানিক শাসনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সুশাসন সরকারের অন্যতম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
দেশের অর্থনীতি ও আইনগত পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। তার মতে, অর্থনীতি ও আইনের শাসন—উভয় ক্ষেত্রেই সরকার নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলো নিষ্পত্তির কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
Muktomon/TA