মুক্তমন রিপোর্ট : জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণ শেষে পাঁচ দিনের নিউইয়র্ক সফর শেষ করে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা ২১ মিনিটে তাঁকে বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেশে ফিরেছেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীরা। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) এ তথ্য জানান।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) একেএম শামছুল ইসলাম, হুইপ মিয়া নুরউদ্দিন আহমেদ অপু, স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার।
নিউইয়র্কে চার কর্মদিবসে ৩০টি কর্মসূচি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতি শেষে একই দিন তিনি নিউইয়র্কে পৌঁছান। ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক থেকে রওনা হয়ে দুবাই হয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে দেশে ফেরেন।
সফরের চার কর্মদিবসে প্রধানমন্ত্রী ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১১টি বৈঠক ও কর্মসূচি ছিল। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ৮০টি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ, তুলে ধরেন বাংলাদেশের অবস্থান
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ। এতে তিনি বিশ্বশান্তি ও মানবতার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সরকারের ‘থ্রি-আর’—রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন কৌশলের কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সবার জন্য সমান সুযোগ এবং কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনার কথা জানান।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বাংলাদেশকে উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্রে পরিণত করার বিষয়েও বক্তব্য দেন তিনি।
সাত দেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
নিউইয়র্ক সফরে সাত দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁরা হলেন—তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফ, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচ, হাইতির প্রধানমন্ত্রী অ্যালিক দিদিয়ে ফিলস-আইমে, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল।
বৈঠকগুলোতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির বিষয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়ে কথা হয়।
ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। ইরান, হাইতি, ভুটান ও থাইল্যান্ডের সরকারপ্রধানদের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রবাসী কর্মী ও জ্বালানি নিরাপত্তা
প্রধানমন্ত্রী মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট উজ হুসাইন মোহাম্মদ লতিফ, কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান এবং সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমার স্টেনারগার্ডের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষা, জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়গুলো আলোচনায় আসে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণসহ বিভিন্ন বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই দীর্ঘস্থায়ী এ সংকটের সমাধান। মিয়ানমারে তাদের ফিরে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো সহযোগিতা চান তিনি।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপ এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহের সঙ্গে বৈঠকেও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক অনুষ্ঠানেও তিনি সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জলবায়ু সহনশীলতা ও বহুপক্ষীয় কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকারও প্রশংসা করেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অর্থায়নের দাবি
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোতে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত ও ব্যাপকভাবে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর আহ্বান জানান।
জলবায়ু অভিযোজনের জন্য সহজলভ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য অর্থায়ন, জলবায়ুবান্ধব প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা
নিউইয়র্কে বাংলাদেশ, সুইডেন ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ আয়োজনে ধাত্রীসেবা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি ‘হেলদি বাংলাদেশ’ গড়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের কেন্দ্রে রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার অতিরিক্ত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। তাঁদের মধ্যে ৮০ হাজার নারী স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন। পাশাপাশি ২৫ হাজার পেশাদার ধাত্রী নিয়োগ এবং সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক
সফরে অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। জেপি মরগান চেজের আয়োজনে অনুষ্ঠিত প্রাতরাশ বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং সম্ভাব্য অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মার্ক সুজম্যান, আন্তর্জাতিক শান্তি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী জেইদ রা’দ আল হুসেইন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারের বিষয় আলোচিত হয়। গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে আলোচনায় জনস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, সাশ্রয়ী মূল্যে টিকা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন গুরুত্ব পায়।
বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১১টি উড়োজাহাজ কিনবে বিমান
প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে বোয়িংয়ের ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই হয়। দেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণ এবং নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ চুক্তি করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন জুবাইদা রহমান
সফরে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নেন। তিনি মোট আটটি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন এবং এর মধ্যে চারটিতে বক্তব্য দেন।
এসব কর্মসূচির মধ্যে ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নারী নেতাদের প্ল্যাটফর্ম, ফার্স্ট স্পাউসেস ডায়ালগ এবং মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং ধাত্রীসেবা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান।
২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের স্বাগত প্রাতরাশে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রী অংশ নেন। একই দিন জাতিসংঘ সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত সংবর্ধনাতেও তাঁরা উপস্থিত ছিলেন।
পাঁচ দিনের সফর শেষে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্যসেবা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।