উগান্ডা হয়ে নাইজেরিয়ায় আসা এক নারীর শরীরে ইবোলা শনাক্ত হয়েছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ৪৪ জনের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে শনাক্তের কাজ শুরু করেছে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
মুক্তমন রিপোর্ট : আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল দেশ নাইজেরিয়ায় ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। দেশটির রাজধানী আবুজায় এক নারীর শরীরে এই ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছে নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ওই নারী উগান্ডা হয়ে নাইজেরিয়ায় এসেছিলেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ অক্টোবর ওই নারীর শরীরে রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। চার দিন পর তাঁকে আবুজার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষায় তাঁর শরীরে ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। তবে তিনি ঠিক কবে নাইজেরিয়ায় প্রবেশ করেছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ পাতে জানিয়েছেন, আক্রান্ত নারীর সংস্পর্শে এসেছিলেন এমন ৪৪ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের পর্যবেক্ষণে আনার পাশাপাশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে কারা এসেছিলেন, তা শনাক্তের মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
সংক্রমণের উৎস নিয়ে তদন্ত
আক্রান্ত নারী উগান্ডা হয়ে নাইজেরিয়ায় এলেও সংক্রমণটি সেখান থেকে হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই নারী দেশটিতে কেবল যাত্রাবিরতি করেছিলেন। তিনি একজন নাইজেরীয় নারী এবং কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ব্যবসায়িক সফর শেষে ফিরছিলেন বলে মন্ত্রণালয়টি জানিয়েছে।
উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, কোনো ব্যক্তি উগান্ডার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করেছেন বলেই সেখানে তাঁর সংক্রমণ ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সংক্রমণের প্রকৃত উৎস নির্ধারণে তদন্ত চলছে। দেশটিতে বর্তমানে ইবোলার কোনো সক্রিয় সংক্রমণ নেই বলেও দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, নাইজেরিয়ার কর্তৃপক্ষ আক্রান্ত নারীর জাতীয়তা প্রকাশ করেনি।
কেনিয়ার পর নাইজেরিয়ায় ইবোলা শনাক্ত
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ইবোলার বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে কেনিয়ায় প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হয়। পরে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে নয়জনে দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে উগান্ডায়ও ইবোলার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দেশটি নিজেকে ইবোলামুক্ত ঘোষণা করে। নতুন করে নাইজেরিয়ায় সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় আঞ্চলিক পর্যায়ে নজরদারি ও প্রস্তুতি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।
নাইজেরিয়ার রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র জানিয়েছে, কেনিয়ায় সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই দেশটিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সম্ভাব্য সংক্রমণ দ্রুত শনাক্ত করা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে পৃথক রাখা, পরীক্ষাগারে রোগ নির্ণয়, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের অনুসরণ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কঙ্গোতে ইবোলার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর গত জুনে নাইজেরিয়া একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে।
প্রাণঘাতী বান্দিবুগিও ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ
আফ্রিকা সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মহাপরিচালক জ্যঁ কাসেয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুতর হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ।
চলমান প্রাদুর্ভাবটি বান্দিবুগিও ধরনের ইবোলা ভাইরাসের কারণে ঘটছে। কাসেয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, আফ্রিকার তিনটি অঞ্চলের একাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়ায় এটি ভৌগোলিক বিস্তারের দিক থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যাপক ইবোলা প্রাদুর্ভাব হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কঙ্গোতে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত ৯ হাজার ৫০০ জনের বেশি আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৪ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আশঙ্কা, বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং প্রাণহানির দিক থেকেও অতীতের ভয়াবহ পরিস্থিতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারিতে ১১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
নাইজেরিয়ায় নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি কতটা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, এখন সেটিই স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সংক্রমণের উৎস শনাক্ত, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা লোকজনকে পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত রোগ নির্ণয়ের ওপরই পরিস্থিতি মোকাবিলার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করছে।