মুক্তমন রিপোর্ট : বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইনে ফেরত নেওয়ার কথা জানিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। তবে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পর তাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা হবে বলে জানিয়েছে দেশটি।
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ব্যাপক অভিযানের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সেই ঘটনার নয় বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটে নতুন করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে মিয়ানমার।
মিয়ানমারের দাবি, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তথ্য তারা পেয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। যাচাই করা তথ্যের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করেছে দেশটি।
রাখাইনের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে শনাক্ত হওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কাজ করা হবে বলে জানিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা।
মিয়ানমারের সামরিক সরকারের দাবি, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর রাখাইনে সেনা অভিযান শুরু হয়।
তবে ওই অভিযানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। সহিংসতার মুখে ২০১৭ সালে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে থেকেই বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা আরও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বসবাস করছিল।
মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। দেশটির কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে এবং বাংলাদেশ থেকে তাদের আগমনের দাবি করে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিবৃতি অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো তালিকার ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য এখনও যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জনকে কথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেছে দেশটি।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে—এমন দাবিও মিয়ানমার প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির দাবি, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর ৫ লাখ ৪০ হাজার মানুষ মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং উত্তর রাখাইনে আরও প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা থেকে যায়।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য দুই বছরের একটি চুক্তি করেছিল। কিন্তু ২০২১ সালে অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটির পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়।
সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি ২০২৩ সালে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে নতুন করে তীব্র লড়াই শুরু হয়। সংঘাতের কারণে আবারও অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
বর্তমানে রাখাইনের বড় একটি অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাস্তবতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে মিয়ানমার তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরানোর কথা বললেও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন কবে শুরু হবে—তা এখনও অনিশ্চিত।