চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগ

সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগানে চা শ্রমিকদের মধ্যে রেইনকোট বিতরণ অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী
সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগানে চা শ্রমিকদের মধ্যে রেইনকোট বিতরণ অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী

মুফিজুর রহমান নাহিদ : চা শ্রমিকদের মজুরি কত টাকা হবে, শুধু সেটিই মূল বিষয় নয়; একজন চা শ্রমিক যাতে স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারেন, সে অনুযায়ী মজুরি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চা বাগানগুলোকে লাভজনক ও টেকসই করতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি।

মঙ্গলবার সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগান মাঠে সরকারের সিএসআর তহবিলের সহযোগিতায় চা শ্রমিকদের মধ্যে রেইনকোট বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন।

চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, চা শিল্পের প্রকৃতি অন্যান্য শিল্পের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। দেশের অনেক চা বাগান দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে রয়েছে। কোনো কোনো বাগানে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করাও সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় চা বাগানগুলোকে টেকসই ও লাভজনক করার পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

তিনি বলেন, যেসব চা বাগানে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও সরবরাহ অবকাঠামোর সুযোগ রয়েছে, সেখানে চা গাছের ক্ষতি না করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বাগানের আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি মসলা জাতীয় গাছ, টিম্বারসহ অন্যান্য উপযোগী সম্পদ ব্যবহারের বিষয়েও কাজ করা হচ্ছে।

চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী চা বাগানগুলোতে প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা হবে। বাগানের রাস্তাঘাট উন্নয়নের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

শ্রমিক পরিবারের নতুন প্রজন্ম যাতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, পাশাপাশি বিভিন্ন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক পেশায় যুক্ত হতে পারে, সেই সুযোগও তৈরি করা হবে বলে জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, চা শিল্পকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে সরকার কাজ করছে। বাগানের আয় বৃদ্ধি, উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ শিল্পকে টেকসই করার লক্ষ্য রয়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশে সরকার নির্ধারিত মূল্যে জ্বালানি বিক্রি হওয়ায় মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি সরাসরি মানুষের নজরে আসে।

তবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যাতে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্বাভাবিকভাবে না পড়ে, সে জন্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক ও নির্বিঘ্ন রাখার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো ঠেকাতে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যাতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা করতে না পারেন, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।

জ্বালানি তেল পাচারের বিষয়ে তিনি বলেন, সীমান্ত রক্ষী বাহিনী এ বিষয়ে সচেতন রয়েছে এবং জেলা পর্যায়েও প্রশাসন নজরদারি করছে। পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্যের পার্থক্য বিবেচনা করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বর্তমানে বড় ধরনের মূল্যপার্থক্যের কারণে জ্বালানি তেল পাচারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না।

বিরোধী দলের সমালোচনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রয়েছে। মানুষের প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও বিশ্লেষণ গঠনমূলক এবং জনস্বার্থে কার্যকর হওয়া উচিত বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গেও সম্পর্কিত।

সরকারি-বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সমন্বয় না হওয়ায় পর্যায়ক্রমে বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একবারে বড় ধরনের বৃদ্ধি না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা মূলত বাজারের চাহিদা ও শ্রমবাজারের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মালিকপক্ষ নির্ধারণ করে থাকে। কোনো প্রতিষ্ঠান বাজারের তুলনায় কম মজুরি দিলে সেখানে প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন কিছু প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতের উদ্যোগের আওতায় আসবে বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসেইন, সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোশনূর রুবাইয়াতসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা এবং চা বাগানের শ্রমিকরা উপস্থিত ছিলেন।

Muktomon/TA