দেশের ৪৪ উদ্ভাবনকে স্বীকৃতি দিল বিআইআইএন, প্রযুক্তি রপ্তানির আহ্বান

বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম
বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম

মুক্তমন রিপোর্ট : নিজস্ব উদ্ভাবন, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে প্রযুক্তির উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, সফটওয়্যার, ডেটা সেন্টার ও ডিজিটাল সেবায় বিশ্বমঞ্চে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।

শনিবার (৩ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর বাড্ডায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি অডিটোরিয়ামে ‘বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডস–২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে শুধু বিদেশি প্রযুক্তির ভোক্তা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নিজস্ব উদ্ভাবন ও গবেষণার মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম ডিজিটাল অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্য রয়েছে উল্লেখ করে ফকির মাহবুব আনাম বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও গবেষণার বিকল্প নেই।

৩৫৫ প্রকল্প থেকে স্বীকৃতি পেল ৪৪টি

এ বছর বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডসে বিভিন্ন খাত থেকে মোট ৩৫৫টি উদ্ভাবনী প্রকল্প জমা পড়ে। দুই দিন ধরে মূল্যায়নের পর সেখান থেকে ৪৪টি উদ্ভাবনকে স্বীকৃতি দিয়েছে আয়োজক বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্ক (বিআইআইএন)।

‘উদ্ভাবনকে স্বীকৃতি, রূপান্তরকে অনুপ্রেরণা’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট, সনদ ও গিফট ভাউচার তুলে দেওয়া হয়। পুরস্কারের মধ্যে ছিল ৯টি চ্যাম্পিয়ন, ১০টি উইনার ও ২৫টি মেরিট অ্যাওয়ার্ড। শিল্প, শিক্ষা, ব্যাংকিং, সরকারি প্রশাসন ও স্টার্টআপ অঙ্গনের ৪০ জন অভিজ্ঞ বিচারক প্রকল্পগুলো মূল্যায়ন করেন।

এ বিপুলসংখ্যক উদ্ভাবনী উদ্যোগ বাংলাদেশের তরুণদের মেধা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার পরিচয় বহন করে বলে মন্তব্য করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্বীকৃতি পাওয়া উদ্ভাবনগুলো বিদেশি প্রযুক্তির অনুকরণ নয়; বরং দেশের বাস্তব সমস্যার সমাধানে তৈরি নিজস্ব উদ্যোগ।

গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগের আহ্বান

দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর অগ্রগতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সম্প্রসারিত মোবাইল ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কার্যকর প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা।

সম্প্রতি চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড এআই কনফারেন্সে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সহযোগিতা, জ্ঞান বিনিময়, সাশ্রয়ী সংযোগ ও ডিজিটাল পাবলিক গুডসের ওপর গুরুত্বারোপের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

তরুণ উদ্ভাবকদের উদ্দেশে ফকির মাহবুব আনাম বলেন, আজকের পুরস্কার তাঁদের যাত্রার শেষ নয়, বরং নতুন অধ্যায়ের সূচনা। একটি প্রোটোটাইপকে বাণিজ্যিক পণ্যে এবং সেই পণ্যকে শিল্পে রূপ দিতে গবেষণা, মূলধন বিনিয়োগ ও নীতিসহায়তা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে সরকার তরুণ উদ্ভাবকদের পাশে থাকবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তরুণ উদ্ভাবকদের প্রথম গ্রাহক হওয়ার পাশাপাশি তাঁদের পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও গবেষণাগার ও শিল্প খাতের চাহিদার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরির আহ্বান জানান তিনি।

উদ্ভাবন, গবেষণা ও ব্যবসার সংযোগ জরুরি

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক, মানবিক, কল্যাণমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সম্পদ সৃষ্টির জন্য বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য অর্জনে শুধু উদ্ভাবনী আয়োজন বা গবেষণা কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। উদ্ভাবন, গবেষণা ও ব্যবসার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার, ব্যবসায়িক খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, দেশে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও উদ্ভাবনকে বাজারজাতকরণ, ইনকিউবেশন ও বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে এখনও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে উদ্ভাবনবান্ধব ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, উদ্ভাবকদের মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, অর্থায়নে প্রবেশাধিকার, গবেষণা ও উন্নয়নে কর-সহায়তা এবং আধুনিক গবেষণা সরঞ্জাম আমদানিতে নীতিসহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়ে কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ইউএনডিপিকে বিভিন্ন উদ্যোগে অংশীদার করা হয়েছে।

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে বিজ্ঞান সচিব বলেন, উৎপাদননির্ভর প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক (এসটিইএম) শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতের চারটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে এসটিইএম ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, রিসার্চ টু মার্কেট, ইনোভেশন টু মার্কেট এবং ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজির কথা তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.) বলেন, শুধু সংযোগ থাকলেই হবে না; প্রয়োজন মানসম্মত ইন্টারনেট, উপযুক্ত ডিভাইস ও সাশ্রয়ী মূল্য। নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যেন উদ্ভাবনের পথে বাধা না হয়ে সহায়ক হয়, সেটিই তাঁদের লক্ষ্য।

চ্যাম্পিয়ন ৯ উদ্ভাবন

এবারের আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মোট ৯টি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছে সক্রিও টেকনোলজিস লিমিটেডের ‘সক্রিও ডিএমএস’—ইন্টেলিজেন্ট সেলস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম; টেটন প্রাইভেট লিমিটেডের ‘মাইইসিজিএআই’—এআই-চালিত ইসিজি ডিভাইস এবং গ্রামীণ হেলথটেক লিমিটেডের ‘দ্য সুখী ওয়ে: কানেক্টেড কেয়ার থ্রু ইন্টিগ্রেটেড ডিজিটাল সার্ভিসেস’।

শিক্ষার্থী ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ‘এজেন্টআইএএম’, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) ‘ক্রনিক’, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ‘সিঙ্ক ভি-১: ব্রেইল এমবসার’, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আরবর’ এবং বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ পাবলিক কলেজের ‘ব্রেইলব্রিজ’। ব্যক্তিগত বা দলীয় ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ‘বিন্দো’ (Bindo)।

চ্যাম্পিয়ন ও উইনার পুরস্কারপ্রাপ্ত উদ্ভাবনগুলো এশিয়া প্যাসিফিক আইসিটি অ্যালায়েন্স (অ্যাপিকটা) অ্যাওয়ার্ডস–২০২৬-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের জন্য মনোনয়ন পাবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআইআইএনের চেয়ারম্যান সৈয়দ আলমাস কবীর। আরও উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী, বিআইআইএনের নির্বাহী পরিচালক রুবাবা দৌলা মতিনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বিচারক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা।

বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্ক (বিআইআইএন) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি উপস্থাপক স্পনসর এবং কার্টআপ পাওয়ার্ড বাই পার্টনার হিসেবে যুক্ত ছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ছিল কৌশলগত অংশীদার।

Muktomon/TA