বাহরাইনের মুক্তা আহরণশিল্পে ঋণের ফাঁদ, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের শ্রম নিয়ন্ত্রণ এবং সৌদি আরবের অভিবাসন আইনের মধ্য দিয়ে কীভাবে গড়ে উঠল স্পনসরশিপভিত্তিক শ্রমব্যবস্থা—তারই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আজকের বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।
দায়মিরা আক্তার :
১৯৩০ সালে বাহরাইনের ব্রিটিশ উপদেষ্টা চার্লস বেলগ্রেভ মুক্তা আহরণশিল্পের শ্রমিকদের অবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখেন। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল Slavery and the Bahrain Pearl Industry। বাহরাইনের মুক্তা আহরণশিল্পে শ্রমিকদের ঋণ, অগ্রিম মজুরি, হিসাবের অস্বচ্ছতা এবং ঋণের কারণে নৌকার মালিকের অধীনে আটকে থাকার যে চিত্র তিনি তুলে ধরেছিলেন, তা ছিল উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রম ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
মুক্তা আহরণ তখন পারস্য উপসাগরের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। তেলের বাণিজ্য অঞ্চলটির অর্থনীতিকে আমূল বদলে দেওয়ার আগে বাহরাইনসহ উপসাগরীয় বিভিন্ন উপকূলের জীবিকা নির্ভর করত এই শিল্পের ওপর। সমুদ্রের তলদেশ থেকে ঝিনুক তুলে মুক্তা সংগ্রহ করতেন ডুবুরিরা। সেই মুক্তা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে ভারতীয় বন্দর, বিশেষ করে বোম্বে, হয়ে ইউরোপের বাজারে পৌঁছাত।
কিন্তু ঝিনুকের ভেতরে মূল্যবান মুক্তা পাওয়ার সম্ভাবনার পেছনে লুকিয়ে ছিল শ্রমিকদের কঠিন জীবন। অনেক ডুবুরির জন্য এই কাজ ছিল শুধু জীবিকা নয়; ছিল এমন এক ঋণচক্র, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যেত।
বেলগ্রেভের প্রতিবেদন এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের সংরক্ষিত নথিতে সেই বাস্তবতার বিবরণ রয়েছে। ব্রিটিশ লাইব্রেরির আর্কাইভে বাহরাইনের মুক্তা আহরণশিল্পের হিসাবপত্র, ঋণের নথি ও ১৯৩০ সালের প্রতিবেদন সংরক্ষিত আছে।
এই ইতিহাসের গুরুত্ব শুধু অতীতের একটি শ্রমব্যবস্থা বোঝার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিকের ঋণ, চলাচলের স্বাধীনতা, নিয়োগকর্তার হাতে আইনি ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের কাছে শ্রমিকের দায় কে বহন করবে—এসব প্রশ্নের সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে পরবর্তী সময়ে বিকশিত অভিবাসী শ্রমিকদের স্পনসরশিপ ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে।
১. মুক্তার নিচে ঋণের অদৃশ্য শৃঙ্খল
মুক্তা আহরণের মৌসুমে ডুবুরিরা মাসের পর মাস নৌকায় থাকতেন। নাকের ক্লিপ লাগিয়ে, পায়ে ভার বেঁধে সমুদ্রের তলদেশে নেমে ঝিনুক সংগ্রহ করতেন তাঁরা। দম ফুরিয়ে এলে সংকেত দিয়ে ওপরে উঠতে হতো। প্রতিদিন অসংখ্যবার একই কাজ করতে হতো তাঁদের।
কিন্তু পরিশ্রমের বিনিময়ে কতটুকু আয় হবে, তা নির্ভর করত এমন একটি হিসাবের ওপর, যার নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলত নৌকার মালিক ও ক্যাপ্টেনের হাতে। আরবি ভাষায় এই ক্যাপ্টেনকে বলা হতো ‘নাখোদা’।
মৌসুম শুরুর আগে ডুবুরিরা নাখোদার কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নিতেন। পরিবারের খাবার, প্রয়োজনীয় খরচ এবং অন্যান্য দায় মেটানোর জন্য এই অর্থ ছিল জরুরি। কিন্তু অগ্রিমের সঙ্গে যুক্ত হতো সুদ। নৌকায় খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দামও তাঁদের হিসাবে যোগ করা হতো। এসব হিসাব কতটা ন্যায্য, তা যাচাই করার সুযোগ অনেক ডুবুরির ছিল না।
মৌসুম শেষে নাখোদা মুক্তা বিক্রি করে আয় হিসাব করতেন। এরপর ডুবুরির পাওনা থেকে অগ্রিম, খাবার, অন্যান্য খরচ এবং সুদ বাদ দেওয়া হতো। অনেক ক্ষেত্রেই মৌসুম শেষে ঋণ কমার বদলে আরও বেড়ে যেত।
এভাবে একজন শ্রমিকের ভবিষ্যৎ শ্রম আগেই ঋণের বিপরীতে আটকে যেত। ঋণ শোধ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে পরবর্তী মৌসুমেও কাজে ফিরতে হতো। ঋণের হিসাব অস্বচ্ছ হলে কিংবা সুদ ও খরচ অস্বাভাবিক হারে বাড়লে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আরও কমে যেত।
ঐতিহাসিক নথিতে এমন ব্যবস্থার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে নাখোদার কাছে ঋণী ডুবুরির শ্রম অন্য নৌকার মালিকের কাছে স্থানান্তরিত হতে পারত। এতে ঋণদাতার পাওনা আদায়ের ব্যবস্থা থাকলেও শ্রমিকের নিজের পছন্দে কাজ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ত।
কিছু ক্ষেত্রে ঋণের বোঝা পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও পড়ত বলে প্রশাসনিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়। বাবা মারা গেলে তাঁর ছেলেকে কাজে নামতে হতো—এমন ঘটনাও মুক্তা আহরণশিল্পের ইতিহাসে নথিবদ্ধ হয়েছে।
এই ব্যবস্থাকে বোঝার জন্য শুধু মজুরি কম ছিল কি না, তা দেখলেই চলে না। মূল প্রশ্ন ছিল, শ্রমিক নিজের শ্রমের মূল্য নির্ধারণে কতটা ভূমিকা রাখতে পারতেন, নিজের হিসাব যাচাই করতে পারতেন কি না এবং ঋণ পরিশোধের পর অন্য কাজ বেছে নেওয়ার বাস্তব স্বাধীনতা তাঁর ছিল কি না।
ঋণ যখন শ্রমিকের ভবিষ্যৎ শ্রমকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন একটি সাধারণ ঋণচুক্তিও কার্যত বাধ্যতামূলক শ্রমের রূপ নিতে পারে।
২. সংস্কার: হিসাবের বই থেকে শ্রমিকের অধিকার
১৯২০-এর দশকে বাহরাইনের মুক্তা আহরণশিল্পে কিছু সংস্কার আনা হয়। ব্রিটিশ প্রশাসনের রাজনৈতিক কর্মকর্তা এবং বাহরাইনের শাসকগোষ্ঠী শ্রমিকদের ঋণ ও পারিশ্রমিকসংক্রান্ত সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়।
সংস্কারের মধ্যে ছিল ডুবুরিদের জন্য হিসাবের বই চালু করা, ঋণের সুদ ও পাওনার হিসাব নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, পারিশ্রমিক ও লাভের অংশ নির্ধারণের প্রশ্ন এবং শ্রমিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য প্রশাসনিক ও বিচারিক প্রক্রিয়া। মুক্তা আহরণশিল্পের নথিতে এসব উদ্যোগের উল্লেখ রয়েছে।
এই উদ্যোগগুলোর তাৎপর্য ছিল—শ্রমিকের ঋণকে শুধু ব্যক্তিগত লেনদেন হিসেবে না দেখে, একটি বৃহত্তর শ্রমসম্পর্কের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা।
তবে সংস্কার হয়েছিল বলেই সব শোষণ শেষ হয়ে গিয়েছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। প্রশাসনিক নথি থেকে বোঝা যায়, সংস্কারগুলোর পেছনে শ্রমিকদের দুরবস্থা কমানোর পাশাপাশি শিল্পের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার বিবেচনাও ছিল।
এখানেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য দেখা যায়। শ্রমিকের ঋণ ও পারিশ্রমিকের হিসাব স্বচ্ছ করার চেষ্টা চলছিল; একই সময়ে বিদেশি শ্রমিকের চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছিল।
এই দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটিই পরবর্তী সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রম অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
৩. শ্রমিকের দায় কে নেবে—সেখান থেকে স্পনসরশিপ
উপসাগরীয় অঞ্চলে বিদেশি শ্রমিকের প্রবেশ ও অবস্থান নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন ধীরে ধীরে স্পনসরশিপভিত্তিক নিয়ম চালু করে। এই ব্যবস্থায় কোনো স্থানীয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিদেশি শ্রমিকের আগমন, অবস্থান এবং প্রশাসনিক দায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকত।
ইতিহাসবিদ ওমর হেশাম আলশেহাবির গবেষণা অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের আধুনিক কাফালা বা শ্রমিক স্পনসরশিপ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক শিকড় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে, বিশেষ করে ১৯২০-এর দশক থেকে ১৯৭০-এর দশকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জনের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। মুক্তা আহরণশিল্পে শ্রমিকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন থেকে স্পনসরশিপের নিয়ম গড়ে ওঠে; পরে তেলশিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে তা আরও বিস্তৃত হয়।
মুক্তা আহরণশিল্পে নাখোদা ছিলেন শ্রমিকের কাজের পরিবেশ ও ঋণের হিসাব নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি। নতুন স্পনসরশিপ ব্যবস্থায় স্থানীয় স্পনসর বা কফিল বিদেশি শ্রমিকের আইনি অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। দুই ব্যবস্থার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে, তবে তারা এক নয়। নাখোদার সঙ্গে ডুবুরির সম্পর্ক ছিল মূলত একটি নির্দিষ্ট শিল্প ও ঋণব্যবস্থার মধ্যে; আধুনিক কাফালা রাষ্ট্রের অভিবাসন, বসবাস ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত আইনের সঙ্গে যুক্ত।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার: কোনো ঐতিহাসিক ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক ব্যবস্থার মিল থাকলেই দুটি ব্যবস্থাকে একই বলে ধরে নেওয়া যায় না। তাদের আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং শ্রমিকের অবস্থান সময়ের সঙ্গে বদলেছে।
তবু একটি প্রশ্ন দুই যুগেই প্রাসঙ্গিক: শ্রমিকের নিয়োগকর্তা বা স্পনসর যদি তাঁর কাজ, বসবাস কিংবা অন্যত্র যাওয়ার সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ পান, তাহলে শ্রমিকের স্বাধীনতা ও অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে?
৪. ‘কাফালা’ শব্দের অর্থ আর আধুনিক ব্যবস্থার বাস্তবতা
‘কাফালা’ আরবি শব্দ। ইসলামি আইনশাস্ত্রে শব্দটি জামিন, দায়গ্রহণ বা অন্যের কোনো দায়িত্ব নিজের ওপর নেওয়ার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু আধুনিক উপসাগরীয় শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রে ‘কাফালা’ বলতে সাধারণত এমন একটি স্পনসরশিপ কাঠামো বোঝানো হয়, যেখানে বিদেশি শ্রমিকের আইনি অবস্থান স্থানীয় স্পনসর বা নিয়োগকর্তার সঙ্গে যুক্ত থাকে।
এই দুই অর্থের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।
ইসলামি আইনশাস্ত্রে কোনো ব্যক্তির দায় গ্রহণের ধারণা থেকে সরাসরি আধুনিক শ্রমিক স্পনসরশিপ ব্যবস্থার সব বিধান এসেছে—এমন দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য আরও নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও আইনগত প্রমাণ প্রয়োজন। একইভাবে, আধুনিক কাফালার কোনো কোনো বৈশিষ্ট্যকে ইসলামি আইনশাস্ত্রের মূল ধারণার সঙ্গে এক করে দেখাও যথার্থ নয়।
গবেষণায় আধুনিক কাফালার বিকাশকে একাধিক প্রভাবের ফল হিসেবে দেখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের শ্রম নিয়ন্ত্রণ, উপসাগরীয় অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস, রাষ্ট্রীয় অভিবাসননীতি এবং স্থানীয় আইন ও প্রথার পরিবর্তন।
তাই কাফালা নিয়ে আলোচনায় দুটি চরম অবস্থানই ইতিহাসকে আড়াল করতে পারে। একদিকে, ব্যবস্থাটির সব বৈশিষ্ট্যকে ধর্মীয় বিধানের সরাসরি ফল বলে দাবি করা যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে, ব্যবস্থার আধুনিক অপব্যবহারের দায় কোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যের ওপর সামগ্রিকভাবে চাপিয়ে দিলেও এর প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস ব্যাখ্যা করা যায় না।
মূল বিশ্লেষণের জায়গা হলো—কোন আইন, কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং কোন অর্থনৈতিক স্বার্থ শ্রমিকের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
৫. সৌদি আরব: রাষ্ট্রীয় আইনে স্পনসরশিপের বিস্তার
সৌদি আরবে আধুনিক কাফালা ব্যবস্থার বিকাশ বুঝতে ১৯৫২ সালের বসবাস-বিধি গুরুত্বপূর্ণ। ওই বছরের ৭ মে গৃহীত এবং ৪ জুন কার্যকর হওয়া Residence Regulations বিদেশিদের প্রবেশ ও অবস্থান নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো তৈরি করে।
তখন সৌদি আরবের অর্থনীতিতে তেলশিল্পের ভূমিকা দ্রুত বাড়ছিল। তেল উত্তোলন, অবকাঠামো নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট সেবাখাতে বিপুল শ্রমের প্রয়োজন তৈরি হয়। দেশের বাইরে থেকে শ্রমিক আনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের প্রবেশ, বসবাস এবং কর্মসংস্থান নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রীয় বিধিব্যবস্থাও সম্প্রসারিত হয়।
আধুনিক কাফালা কাঠামোয় বিদেশি শ্রমিকের বসবাসের অনুমতি ও কাজের অবস্থান স্পনসর বা নিয়োগকর্তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ফলে শ্রমিকের আইনি অবস্থান শুধু তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় বা কর্মচুক্তির ওপর নির্ভর করে না; স্পনসর তাঁর অনুমতি, কাগজপত্র ও প্রশাসনিক অবস্থানের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখতে পারেন।
এই নির্ভরতা শ্রমিকের জন্য বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করে, যখন নিয়োগকর্তা মজুরি আটকে রাখেন, পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট নিজের কাছে রাখেন, প্রয়োজনীয় অনুমতি নবায়ন করেন না কিংবা চাকরি ছাড়ার ক্ষেত্রে বাধা দেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মূল্যায়ন অনুযায়ী, স্পনসরশিপের ওপর নির্ভরতা অভিবাসী শ্রমিকদের চলাচল ও কর্মসংস্থানের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে এবং তাঁদের নির্যাতন, মজুরি না পাওয়া ও জোরপূর্বক শ্রমের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
তবে এখানে আরেকটি পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক অভিবাসী শ্রমিকের আইনি অবস্থান ও অধিকার দাসপ্রথার সঙ্গে এক নয়। কাফালা ব্যবস্থায় কর্মীরা আইনগতভাবে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক; কিন্তু স্পনসরশিপের অপব্যবহার তাঁদের স্বাধীনভাবে চাকরি পরিবর্তন, অভিযোগ করা কিংবা দেশ ছাড়ার সুযোগকে বাস্তবে সীমিত করে দিতে পারে। এই সীমাবদ্ধতার কারণেই ব্যবস্থাটি মানবাধিকার ও শ্রম অধিকারবিষয়ক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
৬. তেলের অর্থনীতি এবং বিদেশি শ্রমের ওপর নির্ভরতা
তেল আবিষ্কার ও উৎপাদন বৃদ্ধির পর উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি বদলে যায়। নতুন রাস্তা, বন্দর, আবাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং নগর অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিপুল শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। স্থানীয় শ্রমশক্তি দিয়ে সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না হওয়ায় বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিক স্পনসরশিপের ব্যবস্থাও আরও বিস্তৃত হয়। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো একদিকে বিদেশি শ্রমিকের শ্রম থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে থাকে, অন্যদিকে তাঁদের স্থায়ী বসবাস, নাগরিকত্ব এবং চাকরি পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত রাখার নীতি বজায় রাখে।
গবেষণায় দেখানো হয়েছে, কাফালা কেবল শ্রমিক ও নিয়োগকর্তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়; এটি রাষ্ট্র, নাগরিকত্ব, অর্থনীতি এবং শ্রমবাজারের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও যুক্ত।
এই কাঠামোয় বিদেশি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এমন অবস্থানে থাকেন, যেখানে কাজের সুযোগের জন্য তাঁদের স্থানীয় স্পনসর প্রয়োজন হয়, অথচ সেই স্পনসরশিপই কখনো কখনো তাঁদের পছন্দের কাজ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা সীমিত করে।
কর্মসংস্থানের সুযোগ ও শ্রমিকের অধিকার—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই তাই উপসাগরীয় শ্রমনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
৭. গৃহকর্মীরা কেন বেশি ঝুঁকিতে
নির্মাণশ্রমিক, কারখানার কর্মী ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত শ্রমিকদের তুলনায় গৃহকর্মীদের পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে আলাদা। তাঁরা নিয়োগকর্তার বাড়িতেই বসবাস করতে পারেন; তাঁদের কর্মস্থল ব্যক্তিগত পরিসরের ভেতরে হওয়ায় বাইরের মানুষের পক্ষে কাজের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। কাজের সময়, বিশ্রাম, মজুরি এবং নিয়োগকর্তার আচরণ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে অভিযোগ জানানোর সুযোগও সীমিত হতে পারে।
সৌদি আরবে এই ঝুঁকির একটি বড় কারণ হলো গৃহকর্মীদের শ্রম আইনের আওতা থেকে বাদ থাকার ইতিহাস। ২০২১ সালের শ্রম সংস্কার নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিশ্লেষণে বলা হয়, সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো গৃহকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করেনি। সংস্থাটির হিসাবে, তখন সৌদি আরবে ৩৭ লাখের বেশি গৃহকর্মী ছিলেন, যাঁদের অনেকেই দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বেতন না পাওয়া, পাসপোর্ট আটকে রাখা, বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাস এবং শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের ঝুঁকিতে ছিলেন।
এখানে সংখ্যাটির সময়কাল গুরুত্বপূর্ণ। ৩৭ লাখের বেশি—এটি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত হিসাব; একে বর্তমান বছরের নিশ্চিত সংখ্যা হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো, তাঁরা নিয়োগকর্তার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকায় কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমা অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা স্বাধীনভাবে বাইরে যাওয়ার সুযোগ না থাকলে একজন কর্মীর পক্ষে অন্য চাকরি খোঁজা বা নির্যাতনের অভিযোগ জানানো আরও কঠিন হয়।
তাই গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষায় শুধু নিয়োগচুক্তি থাকাই যথেষ্ট নয়। তাঁদের কাজের সময়, বিশ্রাম, বেতন, নিরাপদ বাসস্থান, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের অধিকার বাস্তবে কার্যকর কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
৮. বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মী: কর্মসংস্থানের সুযোগ, নাকি অসম ঝুঁকি?
বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরবের শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে কর্মসংস্থান দেশের বহু পরিবারের আয়, ঋণ পরিশোধ, সন্তানদের শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে। কিন্তু বিদেশে কাজের সুযোগের সঙ্গে নিয়োগব্যয়, চুক্তির শর্ত, কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত।
বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়তে পারে, যখন তাঁরা নিয়োগকর্তার বাড়িতে একা থাকেন, স্থানীয় ভাষা জানেন না, স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারেন না অথবা সহায়তা পাওয়ার কার্যকর পথ সম্পর্কে অবগত নন।
আপনার দেওয়া বর্ণনায় ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে নারী গৃহকর্মী নিয়োগ নিয়ে সমঝোতা, মাসিক ৮০০ রিয়াল মজুরির উল্লেখ এবং পরবর্তী সময়ে নারী কর্মীদের ফেরত আসা ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। এসব নির্দিষ্ট তথ্যের পূর্ণাঙ্গ যাচাই ছাড়া সেগুলোকে এখানে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। তবে বৃহত্তর প্রশ্নটি স্পষ্ট: শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি কর্মীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের রয়েছে।
শ্রমিক পাঠানো কেবল কর্মসংস্থানের সংখ্যা বাড়ানোর প্রকল্প নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নিয়োগের ন্যায্যতা, চুক্তির স্বচ্ছতা, বেতন, কাজের পরিবেশ, জরুরি সহায়তা এবং দেশে ফেরার পর ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা।
কোনো কর্মী বিদেশে নির্যাতনের শিকার হলে তাঁর পরিবার অভিযোগ জানাতে পারছে কি না, প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর তদন্ত করছে কি না—এসবও শ্রম অভিবাসন নীতির অংশ হওয়া উচিত।
৯. আবিরণ বেগমের ঘটনা: একটি মামলার তাৎপর্য
আপনার দেওয়া লেখায় খুলনার পাইকগাছার আবিরণ বেগমের মৃত্যুর কথা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন এবং তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় সৌদি আদালতে নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।
এ ধরনের ঘটনা শ্রমিকের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। তবে আবিরণ বেগমের মামলার রায়, পরবর্তী আপিল বা ক্ষমা, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য নথি যাচাই না করে সব বিবরণকে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
বৃহত্তর তাৎপর্যটি হলো, বিদেশে কর্মরত একজন শ্রমিকের মৃত্যুর পর শুধু দেশে মরদেহ ফেরত পাঠানোই যথেষ্ট নয়। মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকলে স্বাধীন তদন্ত, প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা, সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং পরিবারের আইনগত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকা জরুরি।
শ্রমিকের মৃত্যুর সনদে কোনো কারণ লেখা থাকলেই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। আবার পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া প্রতিটি মৃত্যুকে নির্যাতন বা হত্যার ফল বলাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়। প্রয়োজন হলো প্রতিটি ঘটনায় তথ্য, নথি ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সত্য উদ্ঘাটন করা।
ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তাই শুধু একটি মামলার রায় নয়; বিদেশে কর্মরত শ্রমিকের জীবন ও মর্যাদাকে রাষ্ট্র কতটা গুরুত্ব দেয়, তারও পরীক্ষা।
১০. ২০২১ সালের সংস্কার: কাফালা কি সত্যিই বিলুপ্ত হয়েছে?
সৌদি আরব ২০২০ সালের শেষ দিকে শ্রম সংস্কারের ঘোষণা দেয়, যার কিছু অংশ ২০২১ সালের মার্চে কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তে কিছু বিদেশি শ্রমিকের চাকরি পরিবর্তন এবং দেশ ছাড়ার প্রক্রিয়ায় নিয়োগকর্তার অনুমতির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মূল্যায়ন ছিল, এই সংস্কার কাফালা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বিলুপ্ত করেনি। গৃহকর্মীসহ শ্রম আইনের বাইরে থাকা কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা থেকে বাদ পড়েছিলেন। স্পনসরশিপের সঙ্গে যুক্ত বসবাস ও কাজের অনুমতি, পাসপোর্ট আটকে রাখা এবং নিয়োগব্যয়সংক্রান্ত সমস্যাও বহাল ছিল।
এ কারণেই কাফালা বিলুপ্ত হয়েছে—এমন দাবি মূল্যায়নের সময় শুধু সরকারি ঘোষণার ভাষা দেখা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, শ্রমিক বাস্তবে কী করতে পারেন।
তিনি কি নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া অন্য চাকরি নিতে পারেন? মজুরি না পেলে কোথায় অভিযোগ করবেন? নিয়োগকর্তা তাঁর কাগজপত্র আটকে রাখলে কী প্রতিকার পাবেন? নির্যাতনের পরিস্থিতিতে নিরাপদ আশ্রয় ও আইনি সহায়তা পাবেন কি? চাকরি ছেড়ে দিলে তাঁর বসবাসের বৈধতা সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়বে কি না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই দেখাবে সংস্কার কতটা কার্যকর হয়েছে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, ২০২১ সালের সংস্কার সম্পর্কে মানবাধিকার সংস্থার মূল্যায়নকে বর্তমান সময়ের সব নিয়মের সম্পূর্ণ বিবরণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। আইন, প্রশাসনিক নির্দেশনা ও ডিজিটাল সেবার নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বর্তমান আইনি অবস্থার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সৌদি আরবের সর্বশেষ সরকারি বিধান ও বাস্তব প্রয়োগের তথ্য প্রয়োজন।
১১. শ্রমিকের স্বাধীনতা: ইতিহাসের দুই প্রান্তে একই প্রশ্ন
বাহরাইনের মুক্তা ডুবুরিরা ঋণের কারণে একটি নির্দিষ্ট নৌকা ও নাখোদার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তেন। আধুনিক কাফালা ব্যবস্থায় বিদেশি শ্রমিকের বসবাস ও কর্মসংস্থানের আইনি অবস্থান স্পনসর বা নিয়োগকর্তার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।
দুটি ব্যবস্থার মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকলেও তাদের প্রকৃতি এক নয়। প্রথমটির কেন্দ্রে ছিল মুক্তা আহরণশিল্পের ঋণ ও শ্রমসম্পর্ক; দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রীয় অভিবাসননীতি, বসবাসের অনুমতি এবং শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু তুলনাটি আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: শ্রমিকের জীবিকা যখন অন্য একজনের হাতে থাকা হিসাব, অনুমতি বা নথির ওপর নির্ভর করে, তখন তাঁর স্বাধীনতা কতটা বাস্তব থাকে?
একজন শ্রমিকের অধিকার কেবল কাগজে লেখা থাকলেই কার্যকর হয় না। তিনি সেই অধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন কি না, অন্যায় হলে অভিযোগ জানাতে পারছেন কি না এবং অভিযোগের কারণে আরও বড় বিপদে পড়ছেন কি না—এসবই বাস্তব অধিকার নির্ধারণ করে।
এই কারণেই শ্রম অভিবাসনব্যবস্থার সংস্কারকে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা বা শ্রমবাজারের চাহিদা দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে শ্রমিকের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, চলাচলের স্বাধীনতা, চুক্তি পরিবর্তনের সুযোগ এবং বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা।
১২. বাংলাদেশের করণীয়: শ্রমিক পাঠানোর আগে ও পরে
বাংলাদেশের জন্য এই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শ্রমিকের অধিকার রক্ষা—দুটিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
প্রথমত, বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে নিয়োগচুক্তির শর্ত, বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি, বাসস্থান এবং নিয়োগকর্তার পরিচয় যাচাই করতে হবে। কর্মীকে তাঁর বোধগম্য ভাষায় চুক্তির অর্থ বুঝিয়ে দেওয়া এবং চুক্তির কপি তাঁর নিজের কাছে রাখা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, নিয়োগব্যয় ও মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা সম্পর্কে স্বচ্ছতা দরকার। অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে বিদেশে যেতে হলে কর্মী বিদেশে পৌঁছানোর আগেই আর্থিক চাপে পড়েন। পরে মজুরি আটকে গেলে বা চাকরি বদলাতে না পারলে এই ঋণ তাঁর অসহায়ত্ব আরও বাড়াতে পারে।
তৃতীয়ত, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য সহজলভ্য অভিযোগব্যবস্থা, জরুরি আশ্রয়, আইনি সহায়তা এবং দূতাবাসের দ্রুত সাড়া নিশ্চিত করতে হবে। গৃহকর্মীদের মতো ব্যক্তিগত বাসস্থানে কাজ করা কর্মীদের জন্য আলাদা সুরক্ষা ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থত, মৃত্যুর ঘটনা বা নির্যাতনের অভিযোগে দ্রুত তদন্ত এবং পরিবারের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ প্রয়োজন। মরদেহ দেশে ফেরত পাঠানো, ক্ষতিপূরণ বা কূটনৈতিক বিবৃতি—এসবের পাশাপাশি সত্য উদ্ঘাটন ও দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, শ্রমিক পাঠানোর পরিসংখ্যানের পাশাপাশি তাঁদের বাস্তব অবস্থা নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। কতজন কর্মী বেতন পাচ্ছেন না, কতজন অভিযোগ করেছেন, কতটি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে এবং কতজন নিরাপদে দেশে ফিরেছেন—এসব তথ্য নীতিনির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।
অভিবাসন শ্রমিকদের পরিবারের কাছে বিদেশে কাজের সুযোগ প্রায়ই আর্থিক নিরাপত্তার আশ্বাস। সেই আশ্বাস বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধু কর্মীর নয়; নিয়োগকারী রাষ্ট্র, প্রেরণকারী রাষ্ট্র এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোরও রয়েছে।
উপসংহার: মুক্তা বদলেছে, শ্রমিকের প্রশ্ন রয়ে গেছে
একসময় পারস্য উপসাগরের মুক্তা আহরণশিল্পে ডুবুরিরা ঋণের কারণে নাখোদার অধীনে আটকে পড়তেন। পরে তেলশিল্পের বিস্তার, রাষ্ট্রীয় অভিবাসননীতি এবং স্থানীয় স্পনসরশিপের বিকাশের মধ্য দিয়ে বিদেশি শ্রমিকের আইনি অবস্থান নিয়ন্ত্রণের নতুন কাঠামো তৈরি হয়। আধুনিক কাফালা সেই দীর্ঘ ইতিহাসের একটি অংশ—যার বিকাশে ঔপনিবেশিক প্রশাসন, রাষ্ট্রীয় আইন, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং শ্রমবাজারের পরিবর্তন ভূমিকা রেখেছে।
তবে ইতিহাসকে শুধু অতীতের শোষণ আর বর্তমানের দুর্ভোগের সরল রেখা হিসেবে দেখলে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলো হারিয়ে যায়। বাহরাইনের ডুবুরির ঋণব্যবস্থা এবং সৌদি আরবের আধুনিক শ্রম স্পনসরশিপ একই আইনি ব্যবস্থা নয়। তাদের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতে হলে নথি, আইন ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করতে হয়।
এই বিশ্লেষণ থেকে যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা আজও প্রাসঙ্গিক: একজন শ্রমিকের কাজ, বসবাস ও ভবিষ্যৎ যদি অন্য কারও অনুমতির ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তাঁর স্বাধীনতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
মুক্তা আহরণশিল্পের ডুবুরিরা তাঁদের শ্রম দিয়ে উপসাগরের বাণিজ্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। আজকের অভিবাসী শ্রমিকেরা নির্মাণ, সেবা, গৃহকর্ম ও নানা খাতে অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। যুগ বদলেছে, কাজের ধরন বদলেছে, রাষ্ট্রীয় আইনও বদলেছে। কিন্তু শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটি এখনো শ্রমনীতির কেন্দ্রে থাকা প্রয়োজন।
কারণ শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার প্রকৃত মানদণ্ড কোনো ব্যবস্থার নাম নয়—বরং সেই ব্যবস্থার ভেতরে থাকা মানুষটি নিজের কাজ বেছে নিতে, ন্যায্য পারিশ্রমিক পেতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন কি না।
লেখক : সাংবাদিক, বিশ্লেষক