মত প্রকাশ

চামড়ার বাজারের সংকট ও গরুর মাংসের মূল্য: কৃষি অর্থনীতির এক উপেক্ষিত বাস্তবতা

দায়মিরা আক্তার : প্রতি বছর কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের গবাদিপশু খাত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় খামারিদের উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ গবাদিপশুর ক্ষেত্রে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। ভারতীয় গরুর ওপর নির্ভরতা কমে আসা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অর্জন। তবে এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উঠে আসে—গবাদিপশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পরও গরুর মাংসের দাম কেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসছে না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে দেশের গবাদিপশু খাতের বাস্তব অর্থনীতি এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত উপখাতগুলোর দিকে নজর দিতে হবে।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। ফলে গবাদিপশুর জন্য পর্যাপ্ত চারণভূমির অভাব দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। পশুখাদ্যের বড় অংশই এখন উৎপাদন করতে হচ্ছে কৃষিজমিতে। অনেক ক্ষেত্রে ধান, গম কিংবা অন্যান্য ফসলের পরিবর্তে পশুখাদ্যের ঘাস চাষ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে গমের ভূষিসহ গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপকরণের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর। বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট সরাসরি পশুপালনের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।

ফলে গরুর মাংস উৎপাদনের প্রকৃত খরচ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। খামার পর্যায়ে এই ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে প্রতি কেজি মাংসের জন্য ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে বাজারে মাংসের উচ্চমূল্যকে শুধুমাত্র মধ্যস্বত্বভোগী বা তথাকথিত সিন্ডিকেট দিয়ে ব্যাখ্যা করা বাস্তবসম্মত নয়।

তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত—গবাদিপশুর উপপণ্য বা বাই-প্রোডাক্টের মূল্যহ্রাস, বিশেষ করে চামড়ার বাজারের ধস।

কৃষি অর্থনীতিতে কোনো পণ্যের মূল্য নির্ধারণে তার উপপণ্যের বাজারমূল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধানের ক্ষেত্রে খুদ, কুঁড়া ও খড়; সরিষার ক্ষেত্রে খৈল; এবং গবাদিপশুর ক্ষেত্রে চামড়া উল্লেখযোগ্য উপপণ্য। এসব উপপণ্যের ভালো দাম পাওয়া গেলে মূল পণ্যের উৎপাদন ব্যয় আংশিকভাবে সমন্বিত হয়।

একসময় কোরবানির পশুর চামড়া ছিল অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। নব্বইয়ের দশক ও দুই হাজার সালের শুরুর দিকে একটি গরুর চামড়া বিক্রি করে পশুর মূল্যের উল্লেখযোগ্য অংশ পুনরুদ্ধার করা যেত। কিন্তু বর্তমানে সেই বাজার প্রায় ধসে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই একটি বড় গরুর চামড়ার মূল্য নামমাত্র পর্যায়ে নেমে এসেছে।

চামড়ার এই মূল্যহ্রাসের পেছনে দুটি বড় কারণ কাজ করছে।

প্রথমত, বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক চামড়ার চাহিদা কমে গেছে। কৃত্রিম বা সিনথেটিক লেদার প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে দেখতে আকর্ষণীয়, তুলনামূলক সস্তা এবং সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। জুতা, ব্যাগ, জ্যাকেটসহ বিভিন্ন পণ্যে ক্রেতাদের একটি বড় অংশ এখন কৃত্রিম উপাদানের দিকে ঝুঁকছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে প্রাকৃতিক চামড়ার অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের চামড়া শিল্প দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত ও নীতিগত সংকটে ভুগছে। হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের পর শিল্পটির পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণের জন্য কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (ETP) কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়নি—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পরিবেশগত ও কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে ক্রমশ বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য বাজারে, বিশেষ করে ভারতে, ঝুঁকেছেন। ফলে রপ্তানি আদেশ কমেছে, ট্যানারি খাতের সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং কাঁচা চামড়ার চাহিদাও কমে গেছে।

চামড়ার বাজার ধসে পড়ার প্রভাব শুধু চামড়া শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে গবাদিপশু খাত, মাংসের বাজার এবং সংশ্লিষ্ট কৃষি খাতগুলোর ওপর। কারণ একটি গরুর চামড়া থেকে যথাযথ মূল্য পাওয়া গেলে খামারিরা পশু উৎপাদনের ব্যয়ের একটি অংশ পুনরুদ্ধার করতে পারেন, যা শেষ পর্যন্ত মাংসের বাজারমূল্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে চামড়া শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা একটি জাতীয় অর্থনৈতিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য প্রথমত হেমায়েতপুর ট্যানারি শিল্পনগরীর পরিবেশগত ও কারিগরি অবকাঠামো সম্পূর্ণ কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে সরকার ও উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। তৃতীয়ত, রপ্তানিমুখী অন্যান্য খাতের মতো চামড়া শিল্পকেও প্রণোদনা, স্বল্পসুদে ঋণ এবং নীতিগত সহায়তা দিতে হবে।

এছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের দেশীয় ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে চামড়া থেকে কোলাজেন, জেলাটিন ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্য উৎপাদনের সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে গবেষণা ও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাত একটি আন্তঃনির্ভরশীল অর্থনৈতিক কাঠামো। গবাদিপশু, ধান, তেলবীজ, পোলট্রি, মৎস্য ও চামড়া শিল্প পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ফলে চামড়া শিল্পের সংকট কেবল একটি শিল্পখাতের সমস্যা নয়; এটি বৃহত্তর কৃষি অর্থনীতির জন্যও একটি সতর্কবার্তা।

গবাদিপশু খাতকে টেকসই রাখতে হলে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাংসের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে হলে চামড়া শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার বিকল্প নেই। এই খাতের পুনরুদ্ধার শুধু চামড়ার দামই বাড়াবে না, বরং কৃষি অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এটি পত্রিকার উপ-সম্পাদকীয়র উপযোগী করে নিরপেক্ষ, বিশ্লেষণধর্মী ও নীতিকেন্দ্রিক ভাষায় পুনর্লিখন করা হয়েছে।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button