মুক্তমন রিপোর্ট : দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালু করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বসুন্ধরা ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।
অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই আন্তঃসংযুক্ত হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত একটি ভাষা শেখা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও পেশাগত সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক যোগাযোগে দক্ষ করে তুলতে পারে।
তিনি জানান, ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ম্যান্ডারিন (চীনা), জাপানিজ, জার্মান, কোরিয়ান ও আরবিসহ তৃতীয় ভাষা শিক্ষার প্রসারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ইউজিসি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের সব বিভাগীয় অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়কে এ উদ্যোগের আওতায় আনা হবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটসহ এ ধরনের প্রতিষ্ঠান তৃতীয় ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করবে।
ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় বিদেশি ও স্থানীয় ভাষা বিশেষজ্ঞ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষণ উপকরণের প্রয়োজন হবে উল্লেখ করে ইউজিসি সদস্য বলেন, এ জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা হবে। বিশেষ করে ম্যান্ডারিন ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় চীনের দূতাবাসের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা
তৃতীয় ভাষা শিক্ষার সঙ্গে উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণের সম্পর্ক তুলে ধরে অধ্যাপক মামুন বলেন, ম্যান্ডারিনসহ অন্যান্য ভাষা শেখার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার্থী বিনিময়, বৃত্তি, যৌথ একাডেমিক কর্মসূচি, গবেষণা ফেলোশিপ, সামার স্কুল, আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং শিক্ষক-গবেষক বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশকে উচ্চশিক্ষার আঞ্চলিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌথ ও দ্বৈত ডিগ্রি চালুর বিষয়েও ইউজিসি কাজ করছে। চীনের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এ ধরনের সহযোগিতা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিকীকরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
কর্মসংস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাণিজ্য, উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস, প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত। নিজ নিজ বিষয়ে দক্ষতার পাশাপাশি ভাষা ও আন্তঃসাংস্কৃতিক জ্ঞান থাকলে স্নাতকদের আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে কাজের সুযোগ বাড়তে পারে। তাই তৃতীয় ভাষা শিক্ষাকে কর্মসংস্থানযোগ্যতা বৃদ্ধির বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় গুরুত্ব
বাংলাদেশ ও চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গবেষণা সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরে ইউজিসি সদস্য বলেন, ভাষা ও সংস্কৃতির বাইরেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদীয়মান প্রযুক্তি, কৃষি, জলবায়ু, প্রকৌশল, জীবপ্রযুক্তি ও জনস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যৌথ গবেষণার সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট এ ধরনের একাডেমিক সম্পর্ক জোরদারে প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে।
ব্রেইন ড্রেইন থেকে ব্রেইন সার্কুলেশনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ, গবেষক ও পেশাজীবীদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণায় যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, সামার স্কুল, যৌথ তত্ত্বাবধান, গবেষণা সহযোগিতা ও একাডেমিক বিনিময়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জ্ঞান নেটওয়ার্ককে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ও চীনের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতেও ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব রয়েছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক মামুন। তাঁর মতে, একটি ভাষা অন্য একটি সমাজকে বোঝার প্রবেশদ্বার। কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা চীনা ভাষা, ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে চীনা শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবিদদের বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজ সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি কেবল ভাষা শিক্ষার কেন্দ্র নয়, বরং শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময়, গবেষণা সহযোগিতা, বৃত্তি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের চীনা ভাষা শেখার সুযোগ সহজলভ্য করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অধ্যাপক মামুন বলেন, কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভাষার সঙ্গে শিক্ষা, শিক্ষার সঙ্গে গবেষণা, গবেষণার সঙ্গে উদ্ভাবন এবং দক্ষতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগকে যুক্ত করার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ইউনান প্রাদেশিক কমিটির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ঝাও জুনমিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান, ইউনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্টি কমিটির সম্পাদক রুয়ান চাওছি এবং বিকেএসপির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।