ব্রাহ্মণপাড়া (কুমিল্লা) প্রতিনিধি : কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ৮০ নম্বর কালামকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ ব্যয়, বিদ্যালয়ের জমি, পরিচালনা কমিটি, শিক্ষকের অনুপস্থিতি এবং বয়সের অসংগতি থাকা জন্মনিবন্ধনসংক্রান্ত বিষয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিদ্যালয়ের সম্পদ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা রেহেনা আখতার, তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে ভূমিকা এবং পরিচালনা কমিটির কয়েকজন সদস্য। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক হিসাব ও প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ করা অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা হয়নি। স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (স্লিপ), রুটিন মেইনটেন্যান্স, ক্ষুদ্র মেরামত এবং জাতীয় দিবস উদ্যাপনসহ বিভিন্ন খাতের বরাদ্দের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের দাবি, বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তব কাজের পরিমাণ ও ব্যয়ের মধ্যে অসংগতি রয়েছে। কিছু কাজের ব্যয় দেখিয়ে হিসাব সমন্বয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী, বিল-ভাউচার, ব্যাংক হিসাবের লেনদেন এবং বাস্তবায়িত কাজের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন তহবিলের ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকের নামে পরিচালিত অন্য একটি হিসাবের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই হিসাবে কন্টিনজেন্সি বিল, জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন খাতের অর্থ জমা হওয়ার দাবি করা হয়েছে। এসব অর্থের ব্যয় ও ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের আরও দাবি, অতীতেও ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নোটিশ, জবাব এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নথি পাওয়া গেলে অভিযোগের সত্যতা ও অগ্রগতি স্পষ্ট হবে।
বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে শিক্ষিকার স্বামীর হস্তক্ষেপের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, বিদ্যালয়ের জমিদাতার পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার স্বামী মিজানুর রহমান বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও পরিচালনাসংক্রান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন। এমনকি বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকাকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সতর্কবার্তার নথি ও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, আগের সরকারের সময় তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা ছিল। এ অভিযোগের স্বাধীন সমর্থন পাওয়া যায়নি; তাই বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের জমি নিয়ে বিরোধ, সীমানা নির্ধারণের দাবি
বিদ্যালয়ের নামে জরিপ করা ৩৩ শতক জমির দাগ নম্বর ৪৫৯৯ ও ৪৬০১ বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ডে বিএস খতিয়ান নম্বর ২১৯/৮১০, আরএস প্লট নম্বর ৯৭৭ এবং আরএস খতিয়ান নম্বর ২৪০-এর তথ্য দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ভূমির নকশা অনুযায়ী উল্লিখিত দাগের জমিতে বিদ্যালয়ের ভবন নেই। বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে ডোবার মতো যে অংশ রয়েছে, সেটি নকশা ও দাগ নম্বর অনুযায়ী বিদ্যালয়ের জমি বলে তাঁদের দাবি। জমিটি নিয়ে বিরোধ চলমান থাকায় বিদ্যালয়ের প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ এবং দখল হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের দাবি জানানো হয়েছে।
তাঁরা বিদ্যালয়ের দলিল, খতিয়ান, মৌজা নকশা ও মাঠপর্যায়ের জরিপ মিলিয়ে জমির সঠিক সীমানা নির্ধারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিচালনা কমিটির সদস্য নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন
বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির বিদ্যুৎসাহী পুরুষ সদস্য মো. জহিরুল ইসলাম, স্থানীয়ভাবে যিনি বাদল নামে পরিচিত, তাঁর সদস্যপদ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার ভাগিনা হওয়ায় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে সদস্য নির্বাচনের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
এ ছাড়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশনা উপেক্ষা করে কমিটি পরিচালনা এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও করা হয়েছে। তবে কমিটি গঠনের অনুমোদনপত্র, সদস্যদের যোগ্যতা ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
সহকারী শিক্ষিকার অনুপস্থিতির অভিযোগ
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ইফরাত জাহান ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে অনুমতি ছাড়া বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসকে বিষয়টি জানানো হলেও এখনো কার্যকর সমাধান হয়নি।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা, ছুটির আবেদন, অনুমোদিত ছুটির নথি এবং শিক্ষা অফিসের প্রশাসনিক পদক্ষেপ যাচাই করা প্রয়োজন। অনুপস্থিতির অভিযোগ সত্য হলে প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
জন্মনিবন্ধনে জন্মতারিখের অমিল
বিদ্যালয়ে ভর্তির বয়সসংক্রান্ত নিয়মের সঙ্গে একটি শিশুর জন্মনিবন্ধনের তথ্যের অসংগতি রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সরবরাহ করা দুটি জন্মনিবন্ধন যাচাইয়ের ছবিতে একই নাম, বাবা-মায়ের নাম ও জন্মস্থান উল্লেখ থাকলেও জন্মতারিখে পার্থক্য দেখা যায়। একটি নথিতে জন্মতারিখ ৬ এপ্রিল ২০২২ এবং অন্যটিতে ১ ডিসেম্বর ২০২০ উল্লেখ রয়েছে। নথি দুটির নিবন্ধন ও ইস্যুর তারিখও আলাদা।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রথম নথিতে উল্লেখ করা জন্মতারিখ অনুযায়ী শিশুটির বয়স বিদ্যালয়ে ভর্তির উপযোগী না হওয়ায় পরে জন্মতারিখ পরিবর্তন করে নতুন নিবন্ধন করা হয়েছে। তাঁরা আরও অভিযোগ করেছেন, জন্মনিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের দায়িত্বের অপব্যবহার হয়ে থাকতে পারে।
তবে শুধু দুটি নথিতে জন্মতারিখের পার্থক্য থাকলেই জালিয়াতি প্রমাণিত হয় না। সংশ্লিষ্ট জন্মনিবন্ধন কর্তৃপক্ষের মূল রেকর্ড, সংশোধনের আবেদন, সংযুক্ত প্রমাণপত্র এবং বিদ্যালয়ের প্রত্যয়নপত্র যাচাই করে দেখতে হবে পরিবর্তনটি বিধিসম্মতভাবে হয়েছে কি না। শিশুটির ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা বজায় রেখে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিয়েও অভিযোগ
প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে পরিচালিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নতুন গাছ লাগানোর পরিবর্তে গাছের ডাল কেটে রোপণ করা হয়েছে বলে অধিদপ্তরে জানানো হয়েছিল। এ বিষয়ে কর্মসূচির প্রতিবেদন, ছবি, পরিদর্শন নথি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য
অভিযোগগুলোর বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলোকে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ বলে উল্লেখ করেন। তবে তিনি ফোনে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
বিদ্যালয়ের আর্থিক হিসাব, উন্নয়নকাজের বাস্তব অবস্থা, জমির দলিল ও নকশা, পরিচালনা কমিটি গঠনের নথি, শিক্ষকের উপস্থিতি এবং জন্মনিবন্ধনসংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের মতে, তদন্তে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিদ্যালয়ের জমি সরকারি নথি অনুযায়ী সুরক্ষিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের অর্থ ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ, শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।