ঈদের চলচ্চিত্রে ‘এলিটিজম’ বনাম দর্শক বাস্তবতা


দায়মিরা আক্তার : কোরবানির ঈদকে ঘিরে দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে প্রতি বছরই তৈরি হয় বিশেষ প্রত্যাশা। বড় বাজেট, তারকাবহুল আয়োজন, জমকালো প্রচারণা—সব মিলিয়ে ঈদের সিনেমা হয়ে ওঠে দর্শক ও নির্মাতাদের মর্যাদার লড়াই। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রযুক্তি, স্টাইল ও তারকানির্ভর উপস্থাপনার আড়ালে মূল দর্শক-মনস্তত্ত্বকে ধরতে ব্যর্থ হওয়াই বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই সংকটের নাম—“এলিটিজম”।
বিগত ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘প্রিন্স’ এবং ‘দম’—দুই চলচ্চিত্র নিয়েই দর্শকদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র দুটি দর্শকের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংযোগ তৈরি করতে পারেনি। সমালোচকদের মতে, দুই ছবিতেই অভিনয়শিল্পীরা নিজেদের পূর্ববর্তী জনপ্রিয় চরিত্রের আবর্ত থেকে বের হতে পারেননি। ফলে গল্প ও চরিত্রে নতুনত্বের বদলে দর্শক পেয়েছেন পরিচিত আবেগ ও পুনরাবৃত্তির স্বাদ।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের ভাষায়, দর্শক নতুন কিছু চায়; শুধু তারকা উপস্থিতি দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বাজার টিকিয়ে রাখা যায় না। কোরবানির মাংসের মতোই অতিরিক্ত পরিবেশন একসময় আগ্রহ কমিয়ে দেয়। একই ধাঁচের গল্প, সংলাপ ও উপস্থাপনা দর্শকের ক্লান্তির কারণ হয়ে উঠছে।
এবারের ঈদে আলোচনায় রয়েছে ‘রকস্টার’, ‘রইদ’ ও ‘বনলতা সেন’। তবে এসব চলচ্চিত্র ঘিরেও প্রশ্ন উঠছে প্রচারণা কৌশল, দর্শক মনস্তত্ত্ব এবং নির্মাতাদের বাস্তববোধ নিয়ে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র শিল্পে যেখানে মোট বাজেটের বড় অংশ প্রচারণায় ব্যয় করা হয়, সেখানে দেশীয় সিনেমায় প্রচারণা এখনও অনেকাংশে অনিয়মিত ও পরিকল্পনাহীন। ফলে শুরুতে আলোচনার ঝড় তুললেও অনেক সিনেমা দ্রুতই দর্শক আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
বিশেষ করে ‘রকস্টার’ সিনেমার প্রথম গান প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে মনে করছেন, গানটির চেয়ে নায়ক উপস্থিতিই বেশি আলোচিত হয়েছে। ফলে গানটি আলাদা শ্রোতা-সংযোগ তৈরি করতে পারেনি। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি সফল গান শুধু “মনোগ্রাহী” হলেই হয় না, সেটি “শ্রবণগ্রাহী”ও হতে হয়—অর্থাৎ যা দর্শক সচেতনভাবে না শুনেও বারবার শুনতে চায়।
অন্যদিকে ‘রইদ’ চলচ্চিত্রকে ঘিরে রয়েছে “অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা” নিয়ে শঙ্কা। নির্মাণশৈলী ও উপস্থাপনায় ভিন্নতা থাকলেও সেটি সাধারণ দর্শকের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের বৃহৎ দর্শকশ্রেণি এখনও গল্প, আবেগ ও বিনোদনের সহজ সংযোগ খোঁজে।
‘বনলতা সেন’ নিয়েও দর্শক মহলে কৌতূহল রয়েছে। তবে সাহিত্যনির্ভর বা কাব্যিক উপস্থাপনায় অতিরিক্ত পরাবাস্তবতা দর্শকের কল্পনার সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে বলেও অনেকে মনে করছেন। সাহিত্যিক চরিত্র বা কবিতার প্রতীকী উপস্থাপনায় দর্শকের আবেগ অত্যন্ত সংবেদনশীল—এখানে সামান্য বিচ্যুতিও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন “এলিট দর্শক” আর “সাধারণ দর্শক”—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। কারণ সিনেমা হলের পর্দা যত বড়ই হোক, দর্শকের হাতে থাকা “রিমোট” সবার জন্য সমান। দর্শক গ্রহণ না করলে কোনো তারকা, প্রযুক্তি বা উচ্চাকাঙ্ক্ষাই শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রকে সফল করতে পারে না।
তবুও আশার জায়গা রয়েছে। নতুন নির্মাণ ভাবনা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের উপস্থাপনার চেষ্টা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন প্রয়োজন সেই প্রচেষ্টাকে সাধারণ দর্শকের আবেগ, ভাষা ও বাস্তবতার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা। তাহলেই ঈদের চলচ্চিত্র সত্যিকার অর্থে গণমানুষের উৎসবে পরিণত হতে পারবে।



