যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নীতি স্থগিত—মানবিকতার সংকট কতটা গভীর?


ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল গার্ড সদস্যকে গুলি করে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—সব ধরনের আশ্রয় আবেদন স্থগিত করা—তা কেবল মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থায় নয়, বৈশ্বিক মানবাধিকারের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলবে। বিবিসির প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে, প্রশাসন এখন সব বিদেশি নাগরিককে “সর্বোচ্চ মাত্রায় যাচাই” না করা পর্যন্ত আশ্রয় অনুমোদন বা বাতিল—কোনোটিই করবে না। এটি স্পষ্টতই একটি ব্যতিক্রমী ও অভূতপূর্ব পদক্ষেপ।
যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে নিজেকে মানবাধিকারের রক্ষাকবচ হিসেবে তুলে ধরেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দেশটি শরণার্থী পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বিশ্বনেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছে। অথচ একই দেশ আজ একটি ঘটনার সূত্র ধরে সামগ্রিকভাবে আশ্রয় প্রক্রিয়া স্থগিত করছে—যা মানবিক দায়িত্ববোধের প্রশ্নে বড় ধরনের দোলাচলের সৃষ্টি করেছে।
প্রশ্ন হলো—একজন ব্যক্তির অপরাধ বা সম্ভাব্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে কি পুরো আশ্রয়প্রার্থী সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো যৌক্তিক? বিবিসির প্রতিবেদনেই উল্লেখ আছে, হামলাকারী রাহমানউল্লাহ লাকানওয়াল CIA–এর সহযোগী ছিলেন, বিশেষ ইউনিটে কাজ করতেন, এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আগে ও পরে দু’দফা নিরাপত্তা যাচাই পেরিয়েছিলেন। তার অতীত, পেশাগত ঝুঁকি, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে নানা তথ্য উঠে এসেছে। তাহলে কি প্রশাসনের উচিত ছিল না ঘটনার তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা? এক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি—ব্যক্তি বিশেষের আচরণ কখনোই সমগ্র জাতির পরিচয় নয়।
ট্রাম্পের পরবর্তী বক্তব্য অভিবাসন নীতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। তিনি বলেছেন, “তৃতীয় বিশ্বের দেশ” থেকে অভিবাসন স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে, এবং অ-নাগরিকদের সব ফেডারেল সুবিধা বাতিল করা হবে। এমন বিবৃতি কেবল বৈষম্যমূলক নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও শরণার্থী সুরক্ষা সনদের পরিপন্থী। জাতিসংঘও সতর্ক করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রকে তার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে হবে।
এ ধরনের সিদ্ধান্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে যুদ্ধ–বিধ্বস্ত বা রাজনৈতিক নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের, যাদের জীবন এখন অনিশ্চয়তার ছায়ায়। আফগানিস্তান, সিরিয়া, সুদান, সোমালিয়া—অসংখ্য দেশ থেকে নির্যাতিত মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের অপেক্ষায় আছে। তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে সব নথি জমা দিয়েছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, আর প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে সামনে এগোচ্ছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে থেমে যাওয়ায় তারা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে।
বিশ্বজুড়ে অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। ইউরোপ থেকে আমেরিকা—অভিবাসী ও শরণার্থীদের প্রাথমিকভাবে অপরাধী বা বোঝা হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, একটি দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবন—সবকিছুতেই অভিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘মেল্টিং পট’ ধ্যানধারণাই মূলত অভিবাসীদের অবদানের ওপর দাঁড়িয়ে।
পাশাপাশি মনে রাখতে হবে—জাতীয় নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত বা পৃথকীকৃত ব্যবস্থা গ্রহণ সমাজে ভয়, বিভাজন ও বৈষম্য বাড়ায়। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অবস্থান এসব আশঙ্কা আরও তীব্র করছে।
শেষমেশ বলা যায়—ওয়াশিংটন হামলার তদন্ত চলতে পারে, অপরাধী বিচারের মুখোমুখি হবেন—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে পুরো আশ্রয় ব্যবস্থাকে স্থগিত করে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক পরিচিতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এটি বিশ্বব্যাপী অভিবাসী ও শরণার্থীদের প্রতি নেতিবাচক বার্তা পাঠায়, যা মানবাধিকার ও বৈশ্বিক ন্যায়পরায়ণতার ধারণাকে দুর্বল করে।
যে দেশটি একসময় নিপীড়িত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ সে দেশই কি সংকটময় মুহূর্তে দরজা বন্ধ করে দেবে? এ প্রশ্নের জবাব ইতিহাসই লিখবে।
সূত্র: BBC News-এর প্রতিবেদন ভিত্তিক বিশ্লেষণ



