মুক্তমন রিপোর্টার : যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতি ও ইউরোপে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের কারণে মহাদেশটি সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন রাশিয়ার অ্যাম্বাসাডর-অ্যাট-লার্জ আন্দ্রেই বেলোসভ।
রোববার রুশ টেলিভিশন চ্যানেল আরটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেলোসভ বলেন, রাশিয়ার অ-কৌশলগত বা ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার উদ্যোগ থেকে ধারণা করা যায়, ইউরোপীয় যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাকে ওয়াশিংটন গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে।
তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ইউরোপ ক্রমেই সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
বেলোসভের অভিযোগ, রাশিয়াকে অ-কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আলোচনায় যুক্ত করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে মোতায়েন করা নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র এবং বৃহত্তর ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে তৈরি ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
রুশ এই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, রাশিয়ার ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে অধিকতর স্বচ্ছতা তৈরি, মজুত কমানো কিংবা এসব অস্ত্র বিলুপ্ত করার মতো পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাকে উল্টো বাড়িয়ে দিতে পারে।
ইউরোপের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে বেলোসভ বলেন, ওয়াশিংটন তার মিত্রদের ভূখণ্ডকে সামরিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে যেভাবে বিবেচনা করছে, সেটি ইউরোপের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
রাশিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তিনি ইউরোপের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন এবং ন্যাটোর ‘নিউক্লিয়ার শেয়ারিং’ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, এই ব্যবস্থার বিস্তৃতি এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মহড়ায় আরও ন্যাটো সদস্যের অংশগ্রহণ রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বেলোসভ জানান, ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে রাশিয়া তার অ-কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত প্রায় চার গুণ কমিয়ে আনে। অবশিষ্ট অস্ত্রগুলোও কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রও একই ধরনের পদক্ষেপ নেবে বলে মস্কো আশা করেছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপে ইউরোপের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মৌলিক উন্নতি হয়নি বলে মন্তব্য করেন বেলোসভ। বরং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণসংক্রান্ত চুক্তিগুলোর অবসান, নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা এবং মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের আধুনিকায়ন কৌশলগত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে দাবি তার।
রাশিয়া ন্যাটোর ‘নিউক্লিয়ার শেয়ারিং’ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে দেখে—এই অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা শুরু করতে মস্কো উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে ইউরোপ থেকে মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্র প্রত্যাহারের বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রকে উৎসাহিত করতে চায় রাশিয়া।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সংলাপ পুনরায় চালু করার বিষয়ে মস্কো এখনও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন বেলোসভ। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
তার মতে, ভবিষ্যতের যেকোনো কৌশলগত আলোচনা ‘সমান ও অবিভাজ্য নিরাপত্তা’ নীতির ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত। শুধু একটি নির্দিষ্ট অস্ত্র বা বিষয়কে কেন্দ্র করে নয়, বরং কৌশলগত স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে এমন বিস্তৃত ইস্যু আলোচনায় আনা প্রয়োজন।
বেলোসভ আরও বলেন, কৌশলগত অস্ত্রের ক্ষেত্রে নতুন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে রাশিয়া রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামরিক-প্রযুক্তিগত পদক্ষেপের সমন্বয়ে প্রতিক্রিয়া জানাবে। এর লক্ষ্য হবে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা এবং রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য নতুন হুমকি মোকাবিলা করা।
এদিকে বেলোসভের মন্তব্যের সময় ন্যাটোর পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন রেখেছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, ওয়াশিংটন তার পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যদের প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, রাশিয়া ন্যাটোর ভূখণ্ডে হামলা চালাতে পারে—এমন সম্ভাবনা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন। তবে ইউরোপে ন্যাটোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য রুশ সামরিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে ন্যাটো রাশিয়ার অ-কৌশলগত পারমাণবিক সক্ষমতার সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের সমালোচনা করেছে। মস্কোর বক্তব্য হলো, ন্যাটোর তুলনামূলকভাবে বড় প্রচলিত সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র দীর্ঘদিন ধরেই অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনার একটি জটিল বিষয়। দুই দেশই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অ-কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী। এর পাশাপাশি ন্যাটোর পারমাণবিক প্রতিরোধ কাঠামোর আওতায় ইউরোপের কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে রুশ কূটনীতিকের বক্তব্য ইউরোপের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র সীমিত রাখার ক্ষেত্রে এটি ছিল দুই দেশের মধ্যে সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি।