অন্যান্য

ইফতার একটি ইবাদত: ইফতারের সময় দো’য়া ও যিকিরের গুরুত্ব

*এক. ইফতারের সময় দো’য়া-যিকির*: ইফতারের সময় দো’য়া-যিকির করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। ইফতার করা একটি ইবাদাত এবং ইফতারের সময় হলো দো’য়া কবুল হওয়ার জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, সিয়াম পালনকারীর দো’য়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না যতক্ষণ না সে ইফতার করে (তিরমিযী-৩৫৯৮, ইবনে মাজাহ-১৭৫২)। পিতা-মাতার দো’য়া, সিয়াম পালনকারীর দো’য়া এবং মুসাফিরের দো’য়া কবুল হওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে (তিরমিযী-৩৫৯৮; ইবনে মাজাহ-১৭৫২)।

*দুই. দো’য়া-যিকিরের গুরুত্ব*: যিকির হলো আল্লাহর নাম স্মরণ করা, তাঁর প্রশংসা করা, তাঁর পবিত্রতা এবং মহাত্ব ঘোষণা করা। আর দো’য়া হলো আল্লাহর কাছে কোন কিছু প্রার্থনা করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা, রিযিক চাওয়া, আবেদন করা, কোন কিছুর জন্য নিবেদন করা ইত্যাদি। দো’য়ার পূর্বেই যিকির করুন; দরূদে ইবরাহীম পাঠ করুন; এরপর দো’য়া করুন এবং আল্লাহর কাছ থেকে সাহায্য চান, রিজিক চান, সুস্থতা চান, রহমত চান, অনুগ্রহ এবং ক্ষমা প্রার্থনা করুন; ভুলের জন্য ক্ষমা চান।

*তিন. ইফতারের পূর্বে করণীয়*: সিয়াম পালনকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, আপনারা ইফতারের ১০ মিনিট পূর্বে ইফতার সামনে নিয়ে বসুন এবং নিম্নোক্ত দো’য়াগুলো পাঠ করুন। পরিবারের সকল সদস্য একত্রে বসবেন এবং পরিবারের যিনি প্রধান, তিনি সবার পক্ষ থেকে দো’য়া পরিচালনা করবেন।

*চার. দো’য়া-যিকির করার শিষ্টাচার*:

*_১. যিকির করুন:_* প্রথমে তাসবীহ, তাহমীদ, তাকবীর ও তাহলীল পাঠ করুন। তাসবীহ (সুব্‌হান আল্লাহ), তাহমীদ (আল-হামদু লিল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) এবং তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) পাঠ করুন;

_(ক). তাসবীহ, তাহমীদ, তাকবীর এবং তাহলীল:_ *(سُبْحَانَ اللّٰهِ، وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ، وَلَاۤ إِلٰهَ إلَّا اللّٰهُ، وَاللّٰهُ أَكْبَرُ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَةَ إِلَّا بِاللّٰهِ)* উচ্চারণ: সুব্‌হানাল্লাহি, ওয়াল হাম্‌দুলিল্লাহি, ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আক্‌বার; ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ (একবার)। অর্থ: আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি; সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য; আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই; আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ; আল্লাহ ছাড়া নাই কোন অবলম্বন এবং নাই কোন শক্তি-সামর্থ। (মুসলিম:২৬৯৫; তিরমিযী:৩৪৬৯, নাসাঈ:৮৯৪)।

_(খ). তাসবীহ, তাহমীদ, তাকবীর এবং তাহলীল:_ *(اَللّٰهُ أَكْبَرُ كَبِيْرًا؛ وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ كَثِيْرًا؛ وَسُبْحَانَ اللّٰهِ بُكْرَةً وَّأَصِيْلًا؛ لَاۤ إِلٰهَ إلَّا اللّٰهُ؛)* উচ্চারণ: আল্লাহু আকবারু কাবীরা; অয়াল-হাম্‌দু লিল্লাহি কাসীরা; ওয়া সুব্‌হানাল্লাহি বুকরাতাঁও ওয়া-আসীলা; লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ; লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ; (একবার)। অর্থ: “আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব সবার উপরে; অগনিত প্রশংসা আল্লাহর জন্য; এবং সকাল-সন্ধ্যার সকল পবিত্রতা-মহিমা আল্লাহর জন্য”। এই কালিমা যা পাঠ করলে আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। (মুসলিম-ইফাবা-হা/৬০১)। আপনি যখন দো’য়া করবেন তখন আকাশের দরজা সমূহ খুলে দেন।

_(গ). কালিমা-ই-শাহাদাত:_ *(أَشْهَدُ أَنْ لَّاۤ إِلٰهَ إلَّا اللّٰهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ)* উচ্চারণ: আশহাদু আল-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্‌দুহু ওয়া রাসুলুহ (একবার)। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। এরপর,

_(ঘ). আল্লাহর সার্বভৌত্বের ঘোষণা:_ *(لَا إِلٰهَ اِلَّا اللهُ؛ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَ لَهُ الْحَمْدُ؛ وَ هُوَ عَلَى كُلِّ شَيْئٍ قَدِيْرٌ؛)* উচ্চারণ: ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু; ওয়াহ্‌দাহু লা-শারিকা লাহু; লাহুল-মূল্‌ক ওয়া-লাহুল হাম্‌দু; ওয়া-হুয়া আ’লা কুল্লি শাই’য়িন ক্বাদীর’। (একবার)। অর্থ : আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক, তার কোনো শরিক নেই। রাজত্বও তার। প্রশংসা শুধু তারই। তিনিই সব কিছুর সর্বশক্তিমান। (মুসলিম-ইফাবা: ১২২৪), বুখারী (তিরমিযী: ৫/৫১৫)।

*_২. দরূদে ইবরাহীম পাঠ করুন:_* মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর সালাত ও সালাম পাঠ করুন, (দরূদে ইবরাহীম); এরপর,

*_৩. দো’য়া করুন:_* নিজের জন্য, পিতা-মাতা, নিজ পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন এবং সকল মু’মিন-মু’মিনাদের জন্য।

_কুরআনের দো’য়া:_ রাব্বানা সম্বলিত দো’য়াগুলো দিয়ে দো’য়া করুন, হাদীসের দো’য়া: মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর শিখানো দো’য়া দিয়ে দো’য়া করুন, বাংলায় ভাষায় দো’য়া করুন: নিজের পক্ষ থেকে নিজের ভাষায় আল্লাহর নিকট দো’য়া করুন, নিজের নেক-আমলের কথা স্মরণ করুন এবং তার ওসীলায় দো’য়া করুন, পিতা-মাতা, নিজ পরিবারের সদস্য, আত্মীয় ও স্বজনের জন্য দো’য়া করুন, সমস্ত মু’মিন নর-নারীর জন্য দো’য়া করুন।

*_৪. দো’য়ার একটি উদাহরণ:_* হে আমার রব্ব, আমার মাতা-পিতার প্রতি রহম করুন যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে লালন পালন করেছেন (১৭:২৪)। হে আমাদের রব্ব, আমাকে, আমার মাতা-পিতাকে এবং সকল মু’মিনদেরকে ক্ষমা করুন হিসাবের দিনে (বিচার দিবসে) (১৪:৪১)। এরপর দো’য়া শেষ ইফতারের জন্য প্রস্তুতি নিন,

*_৫. ইফ্তারের পূর্বে পঠিতব্য দো’য়া:_* ইফতারের পূর্বে যে সব দো’য়া হাদিস থেকে পাওয়া যায়, সেসব দো’য়া গুলো বাংলায় বলুন: (ক). হে আল্লাহ, আমি প্রার্থনা করছি আপনার দয়া-রহমত এবং প্রার্থনা করছি আপনার ক্ষমা, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। (খ). হে আল্লাহ, আমি তোমারই জন্য সিয়াম রেখেছি এবং তোমরাই রিযক দ্বারা ইফতার করছি। (গ). হে আল্লাহ, আমরা তোমারই জন্য সিয়াম রেখেছি এবং আমরা তোমরাই রিযক দ্বারা ইফতার করছি; অতএব, আপনি আমাদের পক্ষ থেকে এই সিয়াম কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, প্রজ্ঞাবান। এরপর আবার পাঠ করুন,

*_৬. দরূদে ইবরাহীম পাঠ করুন:_* মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর আবারও সালাত ও সালাম পাঠ করুন, (দরূদে ইবরাহীম), এরপর আবার,

*_৭. আল্লাহর প্রশংসা করুন:_* আল্লাহর প্রশংসা করে দো’য়া শেষ করুন। *(سُبْحَانَ اللّٰهِ، وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ، وَلَاۤ إِلٰهَ إلَّا اللّٰهُ، وَاللّٰهُ أَكْبَرُ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَةَ إِلَّا بِاللّٰهِ)* উচ্চারণ: সুব্‌হানাল্লাহি, ওয়াল হাম্‌দুলিল্লাহি, ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আক্‌বার; ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

_এরপর পাঠ করুন:_
*(سُبۡحٰنَ رَبِّكَ رَبِّ الۡعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُوۡنَۚ‏؛ وَسَلٰمٌ عَلَى الۡمُرۡسَلِيۡنَۚ‏؛ وَالۡحَمۡدُ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِيۡنَ؛)*
সুব্‌হানা রাব্বিকা রাব্বিল ইজ্জ্বাতি আ’ম্মা ইয়াসিফূন; ওয়া সালামুন আ’লাল মুরসালীন; ওয়াল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন। অর্থ: তারা (কাফিরেরা) যা আরোপ করে তা হতে পবিত্র ও মহান তোমার রব্ব, যিনি সকল ক্ষমতার অধিকারী; শান্তি বর্ষিত হোক রাসূলগণের প্রতি; সকল প্রশংসা বিশ্বজাহানের রব্ব আল্লাহর জন্য (৩৭:১৮০-১৮২)। এরপর,

*_৮. বিসমিল্লাহ (بِسْمِ اللّٰهِ):_* বিসমিল্লাহ বলে ইফতার শুরু করুন। খেজুর অথবা পানি দিয়ে ইফতার করুন। পাকা খেজুর দিয়ে ইফতার করা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাত। যদি কেউ তা না পায় তবে শুকনো খেজুর দিয়ে ইফতার করবে এবং তা বেজেড় সংখ্যা হওয়া উত্তম। যদি খেজুর না পায় তবে পানি দিয়ে ইফতার করবে। পানি সব সময় সহজ লভ্য পানীয়। (বুখারী-ইফাবা: ১৮৩১; আবু দাউদ-ইফাবা: ২৩৪৮; হাসান)।

*পাঁচ. ইফতার শেষে পঠিতব্য দো’য়া*:

*(ক). (ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ)* উচ্চারণ: যাহাবাজ জামা’উ, অবতালা-তিল উরুক্বু, ওয়া সাবাতিল আজরু, ইন-শা-আল্লাহ। অর্থ: তৃষ্ণা নিবারিত হয়েছে, শিরা-উপশিরা পরিতৃপ্ত হয়েছে এবং আল্লাহ চাহেতো বিনিময় নির্ধারিত হয়েছে (আবু দাউদ-ইফাবা-হা-২৩৪৯; হাদীসে মান, হাসান; সিয়াম অধ্যায়)।

*(খ). (اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنَا وَسَقٰنَا وَ جَعَلَنَا مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ؛)* উচ্চারণ: ‘আল-হামদু লিল্লাহিল্লাজি আত্ব’আমানা, ওয়াসাক্বানা, ওয়া জা’য়ালানা মিনাল মুসলিমীন’। অর্থ: সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদেরকে খাবার খাইয়েছেন এবং পান করিয়েছেন এবং আমাদেরকে মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। (আবু দাউদ, ইফাবা-হা-৩৮০৭,)।

*(গ). (اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنِيْ هَذَا الطَّعَامَ وَرَزَقَنِيْهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي وَلَا قُوَّةٍ؛)* উচ্চারণ: ‘আল-হামদু লিল্লাহিল্লাযি আত্ব’আমানি হাজাত-ত্ব’আমা, ওয়া রাযাক্বানিহী মিন গাইরি হাওলি মিন্নী ওয়ালা ক্বুও-ওয়াতা’। অর্থ: সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে এই খাবার খাইয়েছেন এবং আমাকে জীবনোপকরণ দান করেছেন, যার পেছনে না আছে আমার কোন সামর্থ্য, আর না আছে আমার কোন শক্তি’। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘কেউ যদি খাবার শেষে এ দো’য়া পাঠ করে, তাহলে তার (আগের ও পরের) সকল গোনাহ ক্ষমা করা হয়। (আবূ দাউদ-ইফাবা: ৩৯৮২)।

*আল্লাহ-হুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন*। (মূসা: ১৯-০২-২৬)
১ম রমজান, ১৪৪৭ হিজরী সন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button