অর্থ-বাণিজ্য

বাজেট ২০২৬-২৭: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিই বড় চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা মূলত মূল্যস্ফীতির চাপ কমিয়ে বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে স্থবির হয়ে পড়া বেসরকারি বিনিয়োগে গতি এনে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হবে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট হতে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এটি প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা এবং নতুন সরকারি বেতন কাঠামোর অতিরিক্ত ব্যয় মেটানোর প্রয়োজনীয়তা থেকেই এবারের বাজেটের আকার বড় করা হচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগামী বাজেটে সরকারের আয়, ব্যয়, অর্থায়ন এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে বাজেট সম্পদের পুনর্বণ্টনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, বিনিয়োগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ আগামী বাজেটে প্রতিফলিত হবে। তার মতে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে মূল্যস্ফীতি। সর্বশেষ মে মাসের হিসাবে দেশে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ শুধু মুদ্রানীতি বা বাজেটের ওপর নির্ভর করে না; কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বাজেটে এ বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।

এদিকে, বেসরকারি বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশে। অন্যদিকে সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে উৎপাদনমুখী ও বিনিয়োগবান্ধব ব্যয় বৃদ্ধি জরুরি, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।

বিশেষজ্ঞদের আরেকটি বড় উদ্বেগ বাজেটের ক্রমবর্ধমান ঋণনির্ভরতা। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকতে পারে, যা পূরণে ব্যাংক খাত ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, সরকার অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়ে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এমন বাস্তবতায় নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটকে ঘিরে জনসাধারণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, এই বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনার সক্ষমতার ওপর।

তাদের ভাষায়, বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে কাগজে-কলমের হিসাব দিয়ে নয়; বরং বাজারে গিয়ে মানুষ স্বস্তি পায় কি না এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় কি না, তার মাধ্যমে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button