জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর: সরকারের মূল্য সমন্বয়, বিরোধীদের সমালোচনা, ভোক্তাদের উদ্বেগ


নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। জুন মাসের জন্য পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। নতুন দাম সোমবার (১ জুন) থেকে কার্যকর হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই মূল্য সমন্বয়কে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এর তীব্র সমালোচনা করেছে। একই সঙ্গে সাধারণ ভোক্তা ও পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
কোন জ্বালানির দাম কত?
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বর্তমানে প্রতি লিটার—
- ডিজেল: ১১৫ টাকা (অপরিবর্তিত)
- অকটেন: ১৪৫ টাকা (৫ টাকা বৃদ্ধি)
- পেট্রোল: ১৪০ টাকা (৫ টাকা বৃদ্ধি)
- কেরোসিন: ১৩৫ টাকা (৫ টাকা বৃদ্ধি)
গত মে মাসে অকটেনের দাম ছিল ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা। ডিজেলের দাম তখনও ১১৫ টাকা ছিল।
কেন বাড়ানো হলো দাম?
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির আওতায় প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
২০২৪ সালের মার্চ থেকে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু হয়। এর আওতায় আগের মাসে আমদানি করা জ্বালানির গড় খরচ, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, ডলার বিনিময় হার এবং পরিবহন ব্যয় বিবেচনায় নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
সরকারের দাবি, এই পদ্ধতি চালুর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের ভোক্তারাও তার সুফল পান, আবার দাম বাড়লে সেই প্রভাবও বাজারে প্রতিফলিত হয়।
এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফা চাপ
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করেছিল। এরপর মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে আবারও পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের মূল্য বাড়ানো হলো।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন ব্যয় বাড়ায়। ফলে পণ্য পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়ে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামও বাড়তে পারে। বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ে।
জামায়াত আমিরের তীব্র সমালোচনা
মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার পরপরই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ড. শফিকুর রহমান। তিনি সরকারের এই পদক্ষেপকে “জনস্বার্থবিরোধী” এবং “ধোঁকাবাজি” বলে আখ্যায়িত করেছেন।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, গত মাসেই জ্বালানি তেলের দাম ৮ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। এর ফলে দ্রব্যমূল্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, মানুষের আয় না বাড়লেও দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার খরচ ক্রমাগত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে পুনরায় জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি জনগণের ওপর নতুন বোঝা চাপাবে।
আসন্ন বাজেট অধিবেশনের আগে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়াকেও তিনি সমালোচনা করে বলেন, বাজেট ঘোষণার ঠিক আগে তেলের দাম বাড়ানো হলে তা জনগণের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণার শামিল হবে।
ভোক্তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী, ব্যক্তিগত গাড়িচালক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিবার জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মাসিক ব্যয়ও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে কিছু অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারণ না করলে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি খাতে বড় ধরনের ভর্তুকির চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের জন্য তা টেকসই নাও হতে পারে।
সম্ভাব্য প্রভাব কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে গণপরিবহন বা পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব নাও পড়তে পারে। তবে পেট্রোল ও অকটেনের মূল্য বৃদ্ধি ব্যক্তিগত যানবাহন, রাইড-শেয়ারিং সেবা এবং ছোট পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়াবে।
কেরোসিনের দাম বৃদ্ধির ফলে গ্রামীণ ও উপকূলীয় অঞ্চলের নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপরও কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে, যেখানে এখনো কেরোসিনের ব্যবহার রয়েছে।
সামনে কী?
জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার কারণে আগামী মাসগুলোতেও আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দাম বাড়তে বা কমতে পারে। তবে বাজেটের আগে জ্বালানি তেলের নতুন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, জনঅসন্তোষ এবং বাজারে সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতি নিয়ে আলোচনা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য বজায় রাখা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি যদি ধারাবাহিকভাবে নিত্যপণ্যের বাজারে প্রভাব ফেলে, তবে তা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে তুলতে পারে।



