কে থামাবে নিকুঞ্জের মাদক সিন্ডিকেট?


বিশেষ প্রতিনিধি: রাজধানীর নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেতের টানপাড়া এলাকা কয়েক বছর আগেও ছিল শান্ত ও বসবাসযোগ্য একটি জনপদ। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র বদলে গিয়ে এখন এলাকাটি পরিণত হয়েছে মাদকের এক ভয়াবহ কেন্দ্রে। পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, ছিনতাই, দখলবাজি ও লুটতরাজ এখন নিত্যদিনের ঘটনায় রূপ নিয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকায় মাদকের সহজলভ্যতাই এই অস্থিরতার প্রধান কারণ। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে এলাকাটি ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে খিলক্ষেত থানার পুলিশের ভূমিকা নিয়েও জনমনে ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে নিকুঞ্জ ও টানপাড়া এলাকায় অন্তত ১৩টি নির্দিষ্ট স্থানে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে—টানপাড়া পশ্চিমপাড়া রোডের নজরুলের মেস ও এর শেষ প্রান্ত, জামতলা এলাকায় বাবুলের বাড়ির পাশের খালি জায়গা, আলীজানের টেক, আইজ্জার বস্তি, এটিএন সংলগ্ন খালি জায়গা, পেট্রোবাংলা সংলগ্ন এলাকা, ১৮ নম্বর রোডের পশ্চিম পাশ, জানে আলম স্কুলের আশপাশসহ আরও কয়েকটি স্পট। এছাড়া বিআরটিসি কাউন্টারের সামনে ভাসমান দোকান এবং নিকুঞ্জ-২ এর ১৩ থেকে ১৭ নম্বর রোডের পূর্ব পাশেও নিয়মিত মাদকের আসর বসছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্টের পর থেকে এলাকায় মাদকের বিস্তার আরও বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, এক যুবদল নেতার পরিচয় ব্যবহার করে নূর হোসেন লাল তার ভাইয়ের মাধ্যমে পুরো সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। একইভাবে স্বেচ্ছাসেবক দলের নাম ভাঙিয়ে একাধিক মামলার আসামি মোফাবাবু ও তার সহযোগীরা মাদক ব্যবসায় জড়িত। এছাড়া আরও কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে।
টানপাড়ার মুসলিম কাঁচাবাজার, মধ্যপাড়া এবং আইজ্জার বস্তিসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি চলছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ড চললেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের অভিযান অনেকটাই লোকদেখানো। এমনকি অভিযানের আগেই মাদক কারবারিরা তথ্য পেয়ে পালিয়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, রাতে এলাকায় পুলিশের টহল প্রায় নেই বললেই চলে, ফলে মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাং পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে।
এ বিষয়ে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল আলিম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছেন এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ৩০ এপ্রিলের পর সারা দেশে মাদকের বিরুদ্ধে সমন্বিত চিরুনি অভিযান চালানো হবে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
নিকুঞ্জ ও টানপাড়ার বাসিন্দাদের দাবি—মুষ্টিমেয় অপরাধীর কাছে পুরো এলাকার নিরাপত্তা জিম্মি থাকতে পারে না। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে চিহ্নিত মাদক সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে এলাকায় স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।



