দ্বন্দ্বের চক্রে আফগানিস্তান-পাকিস্তান

আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন
আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন

মুক্তমন রিপোর্ট : ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক ক্রমেই জটিল হয়েছে। একসময় আফগান তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখা পাকিস্তান এখন সীমান্ত নিরাপত্তা, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং আফগান শরণার্থী ইস্যুতে তালেবান সরকারের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছে।

দিল্লি পলিসি গ্রুপের (ডিপিজি) ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের গবেষণা সহযোগী শ্রেয়াস দেশমুখের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ক এখন সহিংসতা, অবিশ্বাস ও পাল্টাপাল্টি চাপের একটি চক্রে আটকে আছে।

তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাকিস্তানের কিছু নীতিই উল্টো আফগান তালেবান সরকারের অভ্যন্তরীণ অবস্থান ও আঞ্চলিক যোগাযোগ জোরদারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

টিটিপি নিয়ে পুরোনো বিরোধ
পাকিস্তানের অন্যতম বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আফগানিস্তানের মাটিতে টিটিপির সদস্যরা নিরাপদ আশ্রয় পাচ্ছে।

তালেবান অবশ্য টিটিপিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখে আসছে। শ্রেয়াস দেশমুখের বিশ্লেষণেও উল্লেখ করা হয়েছে, টিটিপিকে আশ্রয় ও সহযোগিতা দেওয়ার অভিযোগের পক্ষে পাকিস্তান এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি—যদিও পাকিস্তান এ অভিযোগকে নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

টিটিপি মূলত পাকিস্তানের পশতুন অধ্যুষিত উপজাতীয় অঞ্চলগুলোতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোট। ২০১৪ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন জারব-ই-আজব’ শুরু করলে সংগঠনটির অনেক সদস্য আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় চলে যায়।

পরবর্তী সময়ে টিটিপির কিছু অংশ আফগান তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে। আবার কিছু সদস্য ইসলামিক স্টেটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে আইএস খোরাসান প্রদেশ বা আইএসকেপির সঙ্গে যুক্ত হয়।

ডুরান্ড লাইনও বড় বিরোধের কারণ
টিটিপি ছাড়াও দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধ হলো ডুরান্ড লাইন।

আফগান তালেবান সরকার এই সীমারেখাকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। একই সঙ্গে সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী পশতুন জনগোষ্ঠীর বিষয়টি আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্ককে ঐতিহাসিকভাবেই সংবেদনশীল করে রেখেছে।

আফগান ভূখণ্ডে টিটিপির উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপ তাই শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।

দোহা চুক্তিতে তালেবান আফগান ভূখণ্ডকে অন্য কোনো সশস্ত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করতে না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু টিটিপি নিয়ে পাকিস্তানের অভিযোগ এবং তালেবানের অবস্থানের মধ্যে মতপার্থক্য এখনো রয়েছে।

আফগান শরণার্থী ইস্যুতে নতুন চাপ
পাকিস্তান কয়েক দশক ধরে বিপুলসংখ্যক আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে এসেছে। তবে দুই দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কের অবনতির সঙ্গে সঙ্গে শরণার্থী প্রত্যাবাসনের চাপও বেড়েছে।

শ্রেয়াস দেশমুখের বিশ্লেষণে ২০১৬ সালের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। ওই সময়ে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের অবনতির পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক আফগানকে পাকিস্তান থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও পাকিস্তান আফগান শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন জোরদার করেছে। ইসলামাবাদের যুক্তি, বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত আফগান নাগরিক দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি করছে এবং তাদের একটি অংশ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহায়ক হতে পারে।

তবে শরণার্থী প্রত্যাবাসনের বিষয়টি শুধু নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর মানবিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে।

বর্তমানে যাদের একটি বড় অংশ পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, তাদের অনেকেই দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের আফগান। তাদের কেউ কেউ জীবনে কখনো আফগানিস্তানে বসবাসও করেননি।

ইমরান খানের নীতির পরিবর্তন
আফগান শরণার্থী ও তালেবান প্রশ্নে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শ্রেয়াস দেশমুখের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ক্ষমতায় আসার পর আফগান শরণার্থীদের বিষয়ে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নেওয়া হয়েছিল।

ইমরান খান পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া আফগান শরণার্থীদের পরিচয়পত্র দেওয়ার এবং ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। ২০২১ সালে তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরও তিনি তালেবানের বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন।

পরে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আফগান শরণার্থী নীতিতেও কঠোরতা বাড়ে।

দেশমুখের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ইমরান খানের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার পর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক জোট আফগানদের প্রত্যাবাসনের নীতি আরও জোরদার করার সুযোগ পায়।

কেন আফগানদের ফেরত পাঠাচ্ছে পাকিস্তান?
আফগান শরণার্থী প্রত্যাবাসনের পেছনে পাকিস্তান সরকার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কারণের কথা বলছে। তবে দেশমুখের বিশ্লেষণে আরও কিছু রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তার মতে, শরণার্থীদের ফেরত পাঠানো তালেবান সরকারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। কারণ বিপুলসংখ্যক মানুষ আফগানিস্তানে ফিরে গেলে তাদের পুনর্বাসন ও মানবিক সহায়তার দায়িত্ব পড়ে কাবুলের সরকারের ওপর।

অন্যদিকে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের নীতিতে আফগান শরণার্থীরা ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাবের অংশ ছিল বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থান বদলেছে
আফগানিস্তানকে ঘিরে পাকিস্তানের কৌশল আরও জটিল হয়েছে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পরিবর্তিত অবস্থানের কারণে।

রাশিয়া, চীন ও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ তালেবান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও মানবিক স্বার্থের পাশাপাশি আইএসকেপির হুমকি মোকাবিলাও এর একটি কারণ হিসেবে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

বিশেষ করে আইএসকেপির আন্তর্জাতিক তৎপরতা আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের বিষয়। সংগঠনটি ২০২৪ সালে রাশিয়ার মস্কোর ক্রোকাস সিটি হল হামলার দায় স্বীকার করেছিল। মধ্য এশিয়াতেও তাদের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

ফলে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের প্রভাবের পাশাপাশি অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিও নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থে তালেবান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছে।

সামনে কী হতে পারে?
শ্রেয়াস দেশমুখের বিশ্লেষণে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ককে একটি পুনরাবৃত্ত দ্বন্দ্বের চক্র হিসেবে দেখা হয়েছে। টিটিপির হামলা, সীমান্ত বিরোধ, পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপ এবং আফগান শরণার্থী প্রত্যাবাসন—প্রতিটি বিষয় অন্যটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দুই দেশের অবিশ্বাস বাড়াচ্ছে।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সামরিক হামলা বা শরণার্থী প্রত্যাবাসনের মতো পদক্ষেপ আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তালেবানের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এটি লেখকের বিশ্লেষণ, কোনো পক্ষের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়।

পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি তাই জটিল। একদিকে টিটিপির নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি সংঘাতমুখী হলে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে।

দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, নিরাপত্তা, সীমান্ত, পশতুন রাজনীতি এবং শরণার্থী—এই চারটি বিষয় আলাদা করে দেখার সুযোগ কম। একটি ইস্যুতে নেওয়া সিদ্ধান্ত দ্রুত অন্য ইস্যুতেও প্রভাব ফেলছে।

ফলে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে টিটিপি মোকাবিলা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, শরণার্থী প্রত্যাবাসন এবং তালেবান সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ—এই বিষয়গুলো কীভাবে সামাল দেওয়া হয় তার ওপর।

লেখক : শ্রেয়াস দেশমুখ, গবেষণা সহযোগী, ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রাম, দিল্লি পলিসি গ্রুপ (ডিপিজি)

সূত্র: ন্যাশনাল সিকিউরিটি (NatStrat)

Muktomon/TA