মুক্তমন রিপোর্ট : শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সংকটের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শ্রেণিকক্ষে জায়গার সংকট এবং শিক্ষকস্বল্পতাসহ নানা সমস্যার সমাধানের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে মঙ্গলবার দেশজুড়ে ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। এর আগে সোমবারের কর্মসূচিতে ১৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
প্যারিস থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়েছে আন্দোলন
রাজধানী প্যারিসে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কয়েক দিনের মধ্যে ইল-দ্য-ফ্রঁসসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা বেশ কয়েকটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করে কর্মসূচি পালন করছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী থাকায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষকসংকটের কারণে বিদ্যমান শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ তৈরি হয়েছে।
এএফপিকে দেওয়া বক্তব্যে ১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বলেন, তারা ভাঙচুরের উদ্দেশ্যে রাস্তায় নামেনি; বরং শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাগুলো নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতেই বিক্ষোভ করছে। তার দাবি, অনেক শ্রেণিতে ৩৪ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী রয়েছে, যা শিক্ষার্থী ও শিক্ষক—উভয়ের জন্যই চাপ তৈরি করছে।
আহত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পুলিশ সদস্য
মঙ্গলবারের বিক্ষোভে অন্তত ১০ জন শিক্ষক ও কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৪৮ সদস্যও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ফরাসি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের কারণে অন্তত ৪০০টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
বিভিন্ন স্থান থেকে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে কিছু এলাকায় ময়লার পাত্রে আগুন এবং বাসস্টপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষও হয়েছে। পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আটক ৪৪০, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেল বিএফএমটিভিকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে। চূড়ান্ত সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
তবে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনাও উঠেছে। শিক্ষার্থীদের সংগঠন ইউনিয়ন সিন্ডিকাল লিসেয়েনের সভাপতি রিয়াদ রানি পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ করেছেন এবং সরকারের পদক্ষেপকে ‘দমন-পীড়ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে নুনেজ দাবি করেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
সরকারের অবস্থান
ফরাসি শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার স্বীকার করেছেন। তবে সহিংসতা ও স্কুলে অবরোধের নামে এমন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন, যেগুলো শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সরকারি কর্মীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তার মতে, স্কুলের আশপাশে আগুন, আতশবাজি বা সহিংস কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থী, স্কুলকর্মী ও পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পাশাপাশি ধর্মঘট
শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির পাশাপাশি মঙ্গলবার ফ্রান্সজুড়ে বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের ডাকা ধর্মঘটও পালিত হয়েছে। শিক্ষক, হাসপাতালকর্মী ও সরকারি কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়নগুলো বেতন, কর্মপরিবেশ এবং অন্যান্য দাবিতে এই কর্মসূচি পালন করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের হিসাবে, দেশজুড়ে ধর্মঘটে প্রায় ২ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে অধিকাংশ এলাকায় ধর্মঘট ও বিক্ষোভ বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা ও শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর অভিযোগের পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকা এবং বিক্ষোভে সহিংসতার ঘটনাগুলো এখন ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
Muktomon/TA