বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন নাভি পিল্লাই

বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারী জাতিসংঘের সাবেক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাই
বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারী জাতিসংঘের সাবেক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাই

মুক্তমন রিপোর্ট : বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাই। ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর বিচারপ্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার, অভিযুক্তদের অধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার আইনজীবী ও বিচারক নাভি পিল্লাই ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার সুরক্ষা এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারে তাঁর ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এ বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার অবসান ও ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই বিচারপ্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তবে ২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে নাভি পিল্লাই বলেন, ১৯৭১ সালের অপরাধের দায়মুক্তি মোকাবিলা এবং ভুক্তভোগীদের প্রতিকার নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনালের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা জরুরি।

বিচারের ন্যায্যতা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে তিনি সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মৌলিক অধিকার রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তরে বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডে ৭৪ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাভি পিল্লাই।

২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার একটি বিশেষ দায়রা আদালত ওই মামলায় ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। ২৭৭ জনকে খালাস দেওয়া হয়।

পরদিন দেওয়া বিবৃতিতে পিল্লাই বিপুলসংখ্যক আসামির একসঙ্গে বিচার, পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও প্রমাণ পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা এবং ন্যায্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পিলখানা মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় আটক ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতন এবং নিরাপত্তা হেফাজতে কয়েকজনের মৃত্যুর অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাভি পিল্লাই।

তিনি এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, তদন্তের ফল প্রকাশ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তি বা বক্তব্যকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়েও আপত্তি তোলেন তিনি।

পিল্লাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধের বিচার ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি হলেও তা হতে হবে আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ করে। তাঁর এই অবস্থানের কেন্দ্রে ছিল নির্যাতনমুক্ত বিচারপ্রক্রিয়া, পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার।

নাভি পিল্লাইয়ের বক্তব্যে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর) এবং নির্যাতনবিরোধী জাতিসংঘ কনভেনশনের নীতির গুরুত্ব উঠে আসে।

আইসিসিপিআরের ১৪ অনুচ্ছেদে ন্যায্য ও প্রকাশ্য বিচার, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, একই চুক্তির ৭ অনুচ্ছেদে নির্যাতন ও নিষ্ঠুর, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নির্যাতনবিরোধী জাতিসংঘ কনভেনশনেও নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত এবং নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা বক্তব্যকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে।

নাভি পিল্লাইয়ের ২০১৩ সালের বক্তব্য বাংলাদেশের দুটি পৃথক বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একদিকে ছিল ১৯৭১ সালের অপরাধের বিচারে ন্যায্যতার মান বজায় রাখার প্রশ্ন, অন্যদিকে পিলখানা মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামির বিচার এবং হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগের তদন্তের দাবি। তাঁর বক্তব্যে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছিল।

Muktomon/TA