টেলিভিশনের পর্দায় বদলে যাওয়া উপস্থাপনা: রুচি, প্রজন্ম ও গণমাধ্যমের নতুন বাস্তবতা


লুবনা ইয়াসমিন : বাংলাদেশের টেলিভিশন সংস্কৃতি একসময় ছিল পারিবারিক বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বিটিভির একক আধিপত্যের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তীতে বেসরকারি টেলিভিশনের বিস্তার—এই দীর্ঘ যাত্রায় সংবাদ, নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, খেলাধুলা কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল একটি পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে বসিয়ে রাখার মতো উপাদান।
বিশেষ করে আশি ও নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশনের উপস্থাপক ও উপস্থাপিকারা ছিলেন এক ধরনের সাংস্কৃতিক আইকন। তাঁদের পোশাক, ভাষা, উচ্চারণ, উপস্থাপনা—সবকিছুতেই ছিল সংযম, ব্যক্তিত্ব ও এক ধরনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। দর্শক তাঁদের শুধু পছন্দই করতেন না, সম্মানও করতেন।
কিন্তু সময় বদলেছে। প্রযুক্তির পরিবর্তন, বৈশ্বিক সংস্কৃতির বিস্তার এবং ডিজিটাল মিডিয়ার প্রভাব বাংলাদেশের টেলিভিশন শিল্পেও বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এখনকার উপস্থাপনা আগের তুলনায় অনেক বেশি চটকদার, দ্রুতগতির এবং দৃশ্যনির্ভর। বিশেষ করে পোশাক ও স্টাইলিংয়ের ক্ষেত্রে এসেছে বড় ধরনের বৈচিত্র্য। আর এই পরিবর্তনই এখন সমাজে আলোচনা, বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আইনজীবী ও জনস্বাস্থ্য গবেষকের মন্তব্য নতুন করে এই বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর উপস্থাপিকাদের পোশাক কি এখন অতিরিক্ত আধুনিক বা অশালীন হয়ে উঠছে? তাঁর বক্তব্যে আশি দশকের টেলিভিশন সংস্কৃতির প্রতি এক ধরনের নস্টালজিয়া যেমন রয়েছে, তেমনি বর্তমান গণমাধ্যমের উপস্থাপনা নিয়ে বিস্ময় ও অস্বস্তিও রয়েছে।
এই প্রশ্নকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ টেলিভিশন এখনও একটি পারিবারিক মাধ্যম। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষ একই পর্দা দেখেন। ফলে উপস্থাপনা, ভাষা ও পোশাকের ক্ষেত্রে একটি সামাজিক সংবেদনশীলতা থাকা স্বাভাবিক প্রত্যাশা। গণমাধ্যম কেবল ব্যক্তিগত প্রকাশের জায়গা নয়; এটি সমাজের রুচি ও সংস্কৃতিরও প্রতিফলন।
তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা জরুরি যে, সময়ের সঙ্গে পোশাক ও উপস্থাপনার ধরণ বদলানো অস্বাভাবিক নয়। আশির দশকের দর্শক যে বিষয়কে “স্মার্ট” মনে করতেন, আজকের প্রজন্ম সেটিকে সেকেলে ভাবতেই পারে। আবার বর্তমান প্রজন্মের কাছে স্বাভাবিক কোনো ফ্যাশন পুরোনো প্রজন্মের কাছে অস্বস্তিকর লাগতেই পারে। এটাই প্রজন্মগত পার্থক্য।
সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন আমরা পোশাককে একজন মানুষের যোগ্যতা, মেধা বা ব্যক্তিত্বের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করি। একজন উপস্থাপিকার পেশাদারিত্ব তাঁর ভাষা, বাচনভঙ্গি, জ্ঞান, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দক্ষতা ও দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরির ক্ষমতায় প্রকাশ পায়—শুধু পোশাকে নয়।
অন্যদিকে, এটাও সত্য যে কিছু বেসরকারি চ্যানেল দর্শক আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় কখনো কখনো অতিরিক্ত গ্ল্যামারনির্ভর হয়ে পড়ছে। কনটেন্টের গভীরতার চেয়ে বাহ্যিক চাকচিক্যে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য সুখকর নয়।
বাংলাদেশের টেলিভিশন শিল্প এখন একটি সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে বৈশ্বিক মিডিয়া সংস্কৃতির চাপ, অন্যদিকে স্থানীয় সামাজিক মূল্যবোধ ও দর্শকের প্রত্যাশা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
গণমাধ্যমকে অবশ্যই আধুনিক হতে হবে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। কিন্তু সেই আধুনিকতা যেন কেবল পোশাক বা বাহ্যিক চাকচিক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। উপস্থাপনার সৌন্দর্য আসলে রুচি, ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতার মধ্যেই নিহিত।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে—সমাজ যেমন পরিবর্তিত হয়, গণমাধ্যমও তেমনি বদলায়। কিন্তু পরিবর্তনের মধ্যেও যদি শালীনতা, পেশাদারিত্ব ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বজায় থাকে, তাহলেই গণমাধ্যম সত্যিকার অর্থে মানুষের আস্থা ও সম্মানের জায়গা ধরে রাখতে পারবে।
লেখক : আইনজীবী ও জনস্বাস্থ্য গবেষক
২১শে মে ২০২৬



