

কারা উলঙ্গ হয়ে গোসল করে তা আমার জানা নেই, কারণ আমি কারও বাথটাবের সামনে বা কোনো গোসলখানায় কখনো দাঁড়িয়ে থেকে কারও অবগাহন করা দেখিনি। ‘মেরিল’ এর আগে মিল্ক সোপবার এনে সুন্দর শিরোনাম করেছিল– “সর্বশেষ কবে দুধ দিয়ে গোসল করেছিলেন?”– খুবই আকর্ষণীয় ছিল বাক্যটা। যে কেউ প্রভাবিত হয়েছে, এবং একবার ব্যবহারের জন্য হলে-ও, এই সোপবার খরিদ করেছে। আমি নিজেই এমন বিজ্ঞাপনের বাক্যে মোহিত হয়ে এই সাবান খরিদ করেছিলাম।
এবার তারা এনেছে নতুন সোপবার৷ এটার বাক্যটা সেই আগের বাক্যের অনুকরণ করে লিখেছে– “সিরাম দিয়ে গোসল করেছেন কখনো?” সাবানটা ফিমেলবার হিসেবে বাজারে এসেছে। সিরাম হোক, আর দুধ– সমস্যা ওখানে ছিল না, আপত্তি ছিল সিরাম সাবানের ব্যানারে আপত্তিকর ছবির জন্য। বিলবোর্ডে পূজা চেরির একটা গোসলের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে বোঝানো হচ্ছে– পূজা উলঙ্গ হয়ে বাথটাবে সিরাম ঘষে গোসল করে যাচ্ছে। পিটস্থান উন্মুক্ত করে তাকে উলঙ্গ হিসেবে দৃশ্যমান করা হয়েছে। এই সাবান দিয়ে এভাবেই ল্যাংটা সোলাইমান হয়ে অবগাহন করতে হবে।
কেউ বলতেই পারে– “কে কীভাবে আছে, বা ল্যাংটা হয়েছে, তা দেখলে যদি কারও পড়ে যায়, তবে তার হারবালের দারস্থ হওয়া দরকার। এজন্য আন্দোলন করে উক্ত কোম্পানির বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলা গণতান্ত্রিক দেশে ঠিক না৷ এভাবে এসব করে গেলে নারীর কোনো অধিকার থাকবে না। পোশাক-সহ সবকিছু পরতে ও করতে হবে তৌহিদী জনতার কথা মতো। মবের দেশে নারীরা নিজের পেশাতেও স্বাধীন নয়।”
এখানে বিষয়টা বীর্যপাত হওয়া নয়। বিজ্ঞাপনটা সাবানের তো। এখানে সাবান প্রমোট করুক আকর্ষণীয় বাক্য বা সাবানের ছবি দিয়ে অথবা সিরামের গুণগত মান তুলে ধরুক, সাবানের কার্যকারিতা উপস্থাপন করুক, তা না করে, কেন এখানে নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
নাকি বোঝাতে চাচ্ছে স্কয়ার যে, এই সাবান দিয়ে এভাবে ল্যাংটা হয়ে গোসল করলে নারীর অবয়ব পূজার মতো হয়ে যাবে বা এই সাবান কোনো পুরুষ কিনে তা দিয়ে গোসল করলে তার সাথে পূজা এভাবে উলঙ্গ হয়ে গোসল করবে অথবা এই সাবান বউকে দিলে বউ গোসল করার সময় ফেসবুক লাইভ করবে এভাবে উলঙ্গ হয়ে আর ডলার আনবে? বোঝাতে হবে তো– সাবানের সাথে অর্ধ-উলঙ্গ নারীর ছবির সংপৃক্ততা কী? নাকি কোনোভাবে পূজা চেরিই সিরাম? পূজাকে গায়ে ঘষতে হবে আমাদের?
একটা বাচ্চাও জানে যে, সোপবার গোসল করার জন্য, ভিমবার বাসন মাজার জন্য আর লন্ড্রিবার কাপড় কাচার জন্য। নারীকে পণ্য বানানোর বিষয়য়ে আপত্তি তোলাকে নারীর অধিকার হরণ বলে?
আর আরেকটা বিষয় হলো– বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রাষ্ট্র হলে-ও, বাংলাদেশ আত্মমর্যাদাসম্পূর্ণ। পারিবারিক সংস্কৃতি এবং ডানপন্থীতা বহু পূর্ব থেকে এই বঙ্গে– এটা এই ডিজিটাল যুগে শুধু নয়, শতশত বছর থেকে চলে আসা সংস্কৃতি।
আর এটা শুধু মুসলিমদের জন্য নয়। ইতিহাসের পাতায় দেখলে দেখা যায়– অতীতে দলিত বা গরিব নারীদের লজ্জাস্থান আবর্ত করার কর দিতে হতো। বক্ষ ঢাকার জন্য টাকা প্রদান করতে হতো, টাকা না দিলে এভাবে বক্ষ উন্মুক্ত রাখতে হতো। যা ছিল এই অঞ্চলের মানুষের জন্য খুবই লজ্জাকর।
তাই তৎপরবর্তীকালে যখন অবস্থা স্বাভাবিক হয়, তখন নারীরা খাবারের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিত পোশাক বা সমগ্র শরীর ঢেকে রাখাকে। পুরুষরাও নারীকে এজন্য সমর্থন দিত। আগে কাপড়, পরে খাবার রীতি এই বঙ্গে বহু পূর্ব থেকেই বিরাজমান। তাই কথায় বলা হয়– “ভাত-কাপড় দাও।”
কালের বিবর্তন হলেও, এর বিবর্তন হয়নি৷ কিন্তু পশ্চিমা সভ্যতা নামক অসভ্য মিডিয়ার মাধ্যমে নারী-পুরুষকে এই নোংরা তথাকথিত স্বাধীনতার ফাঁদে ফেলতে সফল হয়েছে, যার ফলাফল অবাধ যৌনাচার আর বেহায়াপনা এবং বিকৃত অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন।
মুসলমান বাঙালিরা সবসময়ই নারীকে শালীন পোশাকে রাখতে পছন্দ করে। আবার উচ্চবর্গের হিন্দুরাও তাই ছিল। আপনার এটা জানার জন্য ইতিহাসের পাতায় চোখ দিতে হবে না। আপনি সাহিত্যেই পেয়ে যাবেন। বঙ্কিম, শরৎ, রবীন্দ্র, প্রমথ, মানিক, বিভূতি, নজরুল ইত্যাদি আরও তারা তাদের রচনায় নারীর পোশাকের যে বর্ণনা দিয়েছে, তা শালীন পোশাকই ছিল।
বিশেষ করে শরৎ-রবীন্দ্র তাদের গল্প, উপন্যাস, কাব্যে নারীচরিত্রকে পরিয়েছে ফুলহাতা ব্লাউজ, পেট-পিঠ ঢাকা শরীর, কাপড় দিয়ে পায়ের টাখনু এবং মাথায় কাপড় রাখার বর্ণনা করা শালীন পোশাক। তাই, নারীর শালীন পোশাক এই বঙ্গে আগে থেকেই ছিল এবং এটা শুধু মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত নয়।
উচ্চবর্গের হিন্দু এবং সকল বর্ণের মুসলমানরা মনে করত– নারী সম্মানের জিনিস, নারীকে নারীর মতো করা রাখা উচিত, পরপুরুষের চোখের খোরাক হিসেবে নয়। এজন্য মনে হয় না কখনো প্রশ্ন উঠেছে নারীকে তারা সর্ব শরীর ঢাকা কাপড় পরিয়ে নারীর অধিকার হরণ করেছে, বা এটাও বলেনি– নারীকে ব্লাউজ ছাড়া রাখেনি এজন্য যে, এমন রাখলে শরৎ-রবীন্দ্রের পড়ে যাবে দেখলে।
এসব হলো– সম্ভ্রান্ত পরিবারের নৈতিকতা। যাদের জন্মটা হয়েছে নিম্নমানের তথাকথিত কোনো অন্ধকার স্থানে, তাদের কাছে এসবকে স্বাভাবিক মনে হবে। নারী– নারী হিসেবে থাকুক, নারীকে ভোগ্য করে, নারীকে পণ্য বানিয়ে কোনো দ্রব্যের প্রতি আকৃষ্ট করাকে কি নারীর অসম্মান মনে হয় না? শরীর বা ইজ্জত দেখানো কেমন অধিকার, তা নিয়ে আমার পড়াশোনার দরকার আছে বৈকি।
#পুনশ্চ: আসল ছবিটি খুব করে আপত্তিকর। এজন্য দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সম্পাদিত ছবি ব্যবহার করলাম।
লেখক ও প্রাবন্ধিক- লেখাটি ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া।



