মত প্রকাশ

মমতা-যুগের অবসান: তিস্তা চুক্তিতে কি খুলবে নতুন দিগন্ত?

লুতুব আলি :
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিজেপি। এই রায় শুধু রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রই বদলায়নি, নতুন করে আলোচনায় এনেছে বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তা চুক্তিকে।

বাংলাদেশের জন্য এখন মূল প্রশ্ন—দিল্লির সেই পুরনো অজুহাত, “কলকাতা রাজি নয়”, কি তবে চিরতরে শেষ হলো?

‘মমতা-বাধা’ সরল, এখন পরীক্ষায় দিল্লি
তিস্তা চুক্তি এতদিন আটকে থাকার পেছনে নয়াদিল্লির প্রধান যুক্তি ছিল রাজ্য সরকারের আপত্তি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই দাবি করেছেন, তিস্তার পানি ছাড়লে উত্তরবঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিকল্প হিসেবে তোর্সা ও জলঢাকার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন তিনি।

এখন প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী, রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারী—অর্থাৎ তথাকথিত ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার। ফলে রাজনৈতিক অজুহাতের জায়গা কার্যত সংকুচিত। ঢাকা তাই স্পষ্ট ভাষায় বলছে—এবার বাস্তব অগ্রগতি চাই।

ঢাকার বার্তা: বন্ধুত্ব, তবে স্বার্থের ভিত্তিতে
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শামা ওবায়েদ ইসলাম মনে করিয়ে দিয়েছেন—ভারতের নির্বাচন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে একইসঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যাশাও স্পষ্ট করেছেন:

  • তিস্তার ন্যায্য হিস্যা
  • গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন
  • সীমান্তে পুশ-ইন বন্ধ
  • পর্যটক ভিসা চালু

বার্তাটি পরিষ্কার—সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ, কিন্তু স্বার্থবিষয়ক প্রশ্নে আপস নয়।

বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি: নতুন সুযোগ
বিএনপির পক্ষ থেকে আজিজুল বারী হেলাল মনে করেন, তিস্তা চুক্তির প্রধান বাধা ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দিল্লি ও কলকাতা একসঙ্গে কাজ করলে চুক্তি এগোনোর সম্ভাবনা বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মত: সুযোগ, তবে শর্তসাপেক্ষ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মহসিন মনে করেন, কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দল থাকায় স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, যা চুক্তির পক্ষে সহায়ক হতে পারে।

অন্যদিকে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির সতর্ক করে বলেছেন—পশ্চিমবঙ্গকে যদি কৌশলগত চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের তিন অগ্রাধিকার
বাংলাদেশের প্রত্যাশা মূলত তিনটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে—
১. তিস্তার ন্যায্য পানি বণ্টন
২. সীমান্তে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা
৩. বাণিজ্য ও যোগাযোগের গতি বৃদ্ধি (বিশেষত বেনাপোল-পেট্রাপোল করিডোরে)

শেষ কথা: অজুহাত নয়, এখন ফলাফল
মমতা-যুগে দিল্লির হাতে ছিল একটি শক্ত অজুহাত—“রাজ্য রাজি নয়”। সেই অধ্যায়ের অবসান হয়েছে। এখন যদি চুক্তি এগোয়, তবে তা হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ফল। আর যদি না এগোয়, তাহলে স্পষ্ট হয়ে যাবে—সমস্যা কখনোই শুধু রাজ্য রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না।

ঢাকা এখন অপেক্ষায়।
‘ডাবল ইঞ্জিন’ কি শুধু নির্বাচনী স্লোগান, নাকি তিস্তার জলে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে—সেটাই এখন দেখার।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button