এটকোর বিজ্ঞপ্তি: সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও শ্রম অধিকারের জন্য অশনিসংকেত


আবু জাফর সূর্য : বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন এটকো’র বিজ্ঞপ্তি সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা এবং শ্রম অধিকারের ভয়াবহ সংকট আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো। এমন এক সময়ে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন ‘এটকো’র আজ ১৭ মে’র বিজ্ঞপ্তি সাংবাদিক সমাজকে শুধু হতাশই করেনি, বরং গভীর ক্ষোভ, উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। একজন সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীকে চাকরি পরিবর্তনের আগে পূর্বতন প্রতিষ্ঠানের “অনাপত্তিপত্র” বা “ছাড়পত্র” নিতে বাধ্য করার নির্দেশনা মূলত সাংবাদিকদের স্বাধীন পেশাজীবী হিসেবে নয়, বরং মালিকপক্ষের নিয়ন্ত্রিত অধীনস্ত কর্মচারী হিসেবে দেখার নগ্ন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
এ ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু অযৌক্তিক নয়, এটি সংবিধানস্বীকৃত নাগরিক অধিকার, শ্রম অধিকার এবং পেশাগত স্বাধীনতার পরিপন্থী। একজন সাংবাদিক কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নন। তিনি রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ একজন পেশাজীবী। তাকে “অনাপত্তিপত্র” নামক শর্তে বন্দি করার অপচেষ্টা কার্যত আধুনিক কর্পোরেট দাসত্বের শামিল। এই নীতির মাধ্যমে সাংবাদিকদের স্বাধীন মতপ্রকাশ, পেশাগত বিকাশ এবং কর্মক্ষেত্র বেছে নেওয়ার অধিকারকে নিয়ন্ত্রণের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—গণমাধ্যম মালিকপক্ষ বারবার প্রমাণ করছে, তারা সাংবাদিকদের কেবল প্রয়োজনের সময় ব্যবহারযোগ্য “মানবসম্পদ” হিসেবে দেখে। সরকার বদলায়, রাজনৈতিক বাস্তবতা পাল্টায়, সম্পাদকীয় নীতি পরিবর্তিত হয়; কিন্তু মালিকপক্ষ নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে বহাল তবিয়তে থেকে যায়। অথচ সাংবাদিকদের ভাগ্যে জোটে চাকরিচ্যুতি, মামলা, হয়রানি, সামাজিক অপবাদ এবং অনুগত বা দালাল তকমা।
একটু ফেছনে ফিরে তাকাই,ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিটি ধাক্কা গিয়ে পড়ে মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীদের ওপর, মালিকদের ওপর নয়।
বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিকাশের শুরু থেকেই সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা, সম্প্রচার নীতিমালা এবং গণমাধ্যম কর্মী আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছিল। ২০১০ সালে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের উদ্যোগে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংলাপ ছিল সেই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। প্রয়াত সাংবাদিক নেতা শাহ আলমগীরের নেতৃত্বে এবং তৎকালীন ডিইউজে সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর সূর্যের সক্রিয় ভূমিকার মধ্য দিয়ে আয়োজিত সেই সংলাপে অংশ নিয়েছিলেন সরকারের মন্ত্রী, সচিব, মালিকপক্ষ, বিএফইউজে-ডিইউজের নেতৃবৃন্দ এবং টেলিভিশন সংবাদ বিভাগের প্রধানরা। সম্প্রচার নীতিমালার খসড়া ও প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছিলেন বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল। তার দূরদর্শী প্রস্তাবনা ও সহযোগিতা ছাড়া সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না।
গণমাধ্যম কর্মী আইন প্রণয়নের আন্দোলনেও সাবেক বিএফইউজে সভাপতি মোল্লা জালাল, মহাসচিব শাবান মাহমুদ, ডিইউজে সভাপতি আবু জাফর সূর্য এবং সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংগ্রামী। সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা এবং পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে তারা ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সম্প্রচার নীতিমালা ও গণমাধ্যম কর্মী আইন প্রণয়নের বিষয়ে আন্তরিক ভূমিকা পালন করেছিলেন বলেই সাংবাদিক সমাজে ধারণা রয়েছে। পরবর্তীতে খসড়া আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেলেও রহস্যজনক কারণে তা আর জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হয়নি। আর সেই ব্যর্থতার ফল আজ ভোগ করছে সমগ্র গণমাধ্যমকর্মী সমাজ।
বর্তমানে দেশের গণমাধ্যম শিল্পে চরম বৈষম্য ও নৈরাজ্য বিরাজ করছে। সাংবাদিকতায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের অনেকেই কলকারখানার শ্রমিকদের নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় যেমন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর রয়েছে, তেমন সাংবাদিকদের অধিকার, কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর কোনো রাষ্ট্রীয় তদারকি প্রতিষ্ঠান নেই। তথাকথিত প্রেস কাউন্সিলের অস্তিত্ব থাকলেও সাংবাদিকদের বাস্তব সংকট নিরসনে তার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ।

এই বাস্তবতায় ‘এটকো’র সাম্প্রতিক নির্দেশনা কার্যত সাংবাদিক সমাজের গলায় নতুন শৃঙ্খল পরানোর শামিল। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়; এটি এটকো’র পক্ষে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ, সাংবাদিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং মালিকানাকেন্দ্রিক সামন্তবাদী সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অপচেষ্টা। সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা খর্ব করে, চাকরিকে জিম্মি করে এবং “ছাড়পত্র” সংস্কৃতি চালু করে কোনো সভ্য গণমাধ্যমব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না।
বাংলাদেশের সর্বজনস্বীকৃত জনপ্রিয় সাংবাদিক নেতা প্রয়াত আলতাফ মাহমুদ একসময় সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন ‘নোয়াব’কে ব্যঙ্গ করে “নবাব” বলতেন। তার সেই বক্তব্য ছিল মালিকপক্ষের জমিদারি ও সামন্তবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধে এক তীব্র রাজনৈতিক ও পেশাগত প্রতিবাদ। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকের বাস্তবতা প্রমাণ করছে সেই জমিদারী মানসিকতা এখনো বহাল রয়েছে—শুধু রূপ বদলেছে, চরিত্র বদলায়নি।
‘এটকো’র এই সাংবাদিকবিরোধী, শ্রম অধিকারবিরোধী এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিরোধী নির্দেশনার তীব্র নিন্দা ও কঠোর প্রতিবাদ জানাই। অবিলম্বে এই গণবিরোধী বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা গণমাধ্যম কর্মী আইন দ্রুত কার্যকর, সম্প্রচার নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করতে সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে এই সামন্তবাদী ও নিয়ন্ত্রণমূলক অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।
লেখক : সাংবাদিক
বিঃদ্রঃ-লেখাটি লেখকের একান্ত নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা। এই লেখার সঙ্গে সাপ্তাহিক মুক্তমন এর সম্পাদকীয় নীতি কোনভাবেই সম্পৃক্ত নয়।



