নেতানিয়াহুর গোপন আমিরাত সফর

সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু
সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু

মুক্তমন রিপোর্টার : ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সংক্ষিপ্ত ও গোপনীয় এক সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবু ধাবি গিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ছাড়াই অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের খবর সফর শেষ হওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর প্রকাশ্যে আসে।

নেতানিয়াহুর কার্যালয় পরে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, দুই নেতার আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার এবং আঞ্চলিক অভিন্ন স্বার্থের বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। তবে বৈঠকে ঠিক কী আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

৭ অক্টোবরের হামলা নিয়ে বিতর্ক
নেতানিয়াহুর আমিরাত সফরের অন্যতম আলোচিত দিক হলো ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার আগে কথিত একটি সতর্কবার্তা।

সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামলার প্রায় দেড় সপ্তাহ আগে শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ ইসরায়েলি নেতৃত্বকে হামাসের সম্ভাব্য হামলা সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তবে নেতানিয়াহুর কার্যালয় এ ধরনের প্রতিবেদনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

বিবিসি ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু বৈঠকে ওই সতর্কবার্তা-সংক্রান্ত বর্ণনা অস্বীকার করার জন্য আমিরাতের প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে থাকতে পারেন। তবে এ বিষয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অবসরপ্রাপ্ত ইসরায়েলি কর্নেল ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনের উপদেষ্টা জ্যাক নেরিয়া মনে করেন, এ ধরনের বিতর্ক দুই নেতার সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি করে থাকতে পারে। তার মতে, আবু ধাবির বৈঠক সেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে।

এটি অবশ্য নেরিয়ার বিশ্লেষণ; নেতানিয়াহু সফরটির মূল উদ্দেশ্য হিসেবে এমন কোনো বিষয় প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেননি।

কেন সফরটি গোপন রাখা হয়েছিল?
নেতানিয়াহুর সফরটি আগে থেকে ঘোষণা করা হয়নি। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সফর শেষে প্রতিনিধি দল দেশে ফেরার পর বৈঠকের ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু নেতানিয়াহু ইসরায়েলে ফেরার আগেই সফরের খবর প্রকাশ্যে চলে আসে।

এর ফলে সফরের তথ্য কীভাবে ফাঁস হলো এবং কার স্বার্থে তা প্রকাশ্যে এলো—এ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষক জ্যাক নেরিয়া মনে করেন, সফরের খবর প্রকাশ্যে আসায় নেতানিয়াহু আমিরাতের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও সম্পর্ক অটুট থাকার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন।

তবে সফরের তথ্য নেতানিয়াহু বা তার ঘনিষ্ঠদের পক্ষ থেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল—এমন কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।

ইরানও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট ইরান। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বৈঠকে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনার পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্কও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সংযুক্ত আরব আমিরাত একদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রেখেছে।

ফলে ইরানকে ঘিরে ইসরায়েল ও আমিরাতের মধ্যে আলোচনা হলেও দুই দেশের কৌশলগত অবস্থান পুরোপুরি অভিন্ন—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো আমিরাতও আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছে।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব
নেতানিয়াহুর সফরের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একই সময়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে ও পরে সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদারের সঙ্গে নেতানিয়াহুর উচ্চপর্যায়ের বৈঠক তার আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আনার সুযোগ তৈরি করে।

তবে এই সফর সরাসরি নির্বাচনী উদ্দেশ্যে হয়েছে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণও প্রকাশ্যে নেই।

দুই দেশের সম্পর্কে আগে থেকেই টানাপোড়েন
নেতানিয়াহু ও শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের মধ্যে যোগাযোগ নিয়ে এর আগেও প্রকাশ্য মতপার্থক্য দেখা গেছে।

এর আগে নেতানিয়াহুর কার্যালয় দাবি করেছিল, ইরানের সঙ্গে সংঘাত চলাকালে তিনি আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আল আইন শহরে একটি গোপন বৈঠক করেছিলেন। সে সময় আমিরাত এ দাবি প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছিল।

আমিরাতি কর্মকর্তারা বরাবরই বলে আসছেন, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক একটি ঘোষিত ও স্বচ্ছ কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।

এই পটভূমিতে এবারের গোপন সফর দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের সংবেদনশীলতাকেও সামনে এনেছে।

সফরের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য কী?
এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা তথ্য বিশ্লেষণ করলে নেতানিয়াহুর আবু ধাবি সফরের সম্ভাব্য তিনটি দিক সামনে আসে।

প্রথমত, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক: ৭ অক্টোবরের হামলার আগে কথিত সতর্কবার্তা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের পর দুই নেতার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা: ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েল ও আমিরাতের মধ্যে মতবিনিময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তৃতীয়ত, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর জন্য আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সফরটির সরাসরি নির্বাচনী উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।

সব মিলিয়ে, নেতানিয়াহুর এই সফরের আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্বার্থের কথা বলা হলেও, ৭ অক্টোবরের হামলা নিয়ে বিতর্ক, ইরান পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন—এই তিনটি বিষয় সফরটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Muktomon/TA