১৪ বছরেই বিয়ে, দুই সন্তানের মা নাইনার এখন যাওয়ার জায়গা নেই

Married at 14, a young mother in Nepal now has nowhere to go
Married at 14, a young mother in Nepal now has nowhere to go

মুক্তমন রিপোর্ট : মাত্র ১৪ বছর বয়সে পরিবারের অমতে বাড়ি ছেড়ে বিয়ে করেছিলেন নেপালের আচ্ছাম জেলার নায়না (ছদ্মনাম)। এখনো ২০ বছর পূর্ণ হয়নি তার। এরই মধ্যে দুই কন্যাসন্তানের মা হয়েছেন তিনি। কিন্তু স্বামীর পরিবারের চাপে এখন বিয়ে ভেঙে দেওয়ার পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন এই তরুণী।

তবে বিচ্ছেদ হলেও নাইনাকে যে নতুন কোনো নিরাপদ আশ্রয় দেবে—তারও নিশ্চয়তা নেই।

শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেননি তিনি। নিজের কোনো আয় নেই। অল্প বয়সে পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে করায় নিজের পরিবার থেকেও হারিয়েছেন সমর্থন। বাবা-মাও এখন তার সঙ্গে কথা বলেন না।

অন্যদিকে পড়াশোনার জন্য স্বামী কাঠমান্ডুতে চলে যাওয়ার পর তার সঙ্গে দূরত্ব ক্রমেই বেড়েছে। নায়নার অভিযোগ, স্বামীর বাড়িতে তাকে নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। বিশেষ করে দুই সন্তানই মেয়ে হওয়ায় তাকে নানা কথা শুনতে হয়েছে।

নাইনা বলেন, “আমার বাবা-মায়ের দিক থেকেও কথা বলার মতো কেউ নেই। এখন আমি কোথায় যাব? আমার দুটি মেয়ে, অথচ আমার কোনো শিক্ষা নেই।”

পুলিশের কাছে গিয়েও সমাধান হয়নি

পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে নায়না দুইবার পুলিশের কাছে গেছেন। কিন্তু তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুইবারই বিষয়টি মীমাংসার নামে স্বামী-স্ত্রীকে পুনরায় একসঙ্গে থাকার জন্য লিখিত চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়।

নায়না বলেন, “তারা আমাদের একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু আমি ফিরে যাওয়ার পর আবার একই আচরণ শুরু হয়।”

তার অভিজ্ঞতা নেপালের গ্রামীণ অঞ্চলে অল্প বয়সে বিয়ে করা অনেক মেয়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিয়ের পর থেমে যায় পড়াশোনা, বাড়ে ঝুঁকি

আচ্ছামে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বিয়ে করা মেয়েদের অনেকেই বিয়ের পর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন না। অল্প বয়সেই তাদের গর্ভধারণের মুখোমুখি হতে হয়।

শারীরিক ও মানসিকভাবে পূর্ণ পরিণত হওয়ার আগেই গর্ভধারণের ফলে কিশোরী মায়েদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সংসারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের ক্ষমতা সীমিত থাকে।

কিছু ক্ষেত্রে অল্প বয়সে বিয়ের পর শারীরিক নির্যাতন, পুত্রসন্তানের জন্য চাপ এবং শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে।

অনেক কিশোরী একই সময়ে এসব সমস্যার একাধিকটির মুখোমুখি হচ্ছে।

ছয় বছরে ৩ হাজারের বেশি কিশোরীর গর্ভধারণ

আচ্ছাম জেলা স্বাস্থ্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ছয় বছরে জেলায় ২০ বছরের কম বয়সী ৩ হাজার ৫ জন কিশোরী গর্ভবতী হয়েছেন।

একই সময়ে জেলাটিতে ৩৬২টি মৃত সন্তান প্রসবের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্যকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব মৃত সন্তান প্রসবের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মায়ের বয়স ছিল ২০ বছরের নিচে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের সঙ্গে মা ও শিশুর বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি জড়িত। ফলে অল্প বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণ শুধু পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিচ্ছেদও সবসময় মুক্তির পথ নয়

নাইনার মতো মেয়েদের সংকট শুধু বাল্যবিবাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিয়ের পর নির্যাতনের শিকার হলেও নিজের পরিবারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ অনেকের থাকে না। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাবে তারা আর্থিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

ফলে স্বামীর বাড়িতে নির্যাতন চললেও সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।

নাইনার সামনে এখন সেই বাস্তবতাই দাঁড়িয়ে আছে—স্বামীর পরিবারের চাপ, স্বামীর দূরত্ব, নিজের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, কোনো আয় নেই এবং দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

তার প্রশ্ন তাই শুধু নিজের জন্য নয়, অল্প বয়সে বিয়ের পর একই পরিস্থিতিতে পড়া অনেক কিশোরী মায়ের জন্যও—নির্যাতনের সংসার থেকে বেরিয়ে গেলে তারা কোথায় যাবে?