মুক্তমন রিপোর্ট : বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর অনেকটাই প্রত্যক্ষ করেছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। ১৯৪৬ সালে ৫১টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই বৈশ্বিক মঞ্চ সময়ের সঙ্গে সদস্যসংখ্যা ও পরিধিতে যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি এখানে ঘটেছে নানা স্মরণীয় ও বিতর্কিত ঘটনা।
কখনো তীব্র বাক্যবিনিময়, কখনো দীর্ঘ বক্তৃতা, আবার কখনো প্রতিবাদে অধিবেশন বর্জন—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনাই রয়েছে, যেগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচিত হয়েছে।
১৯৬০ সালের অধিবেশন শীতল যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়ের একটি আলোচিত ঘটনার সাক্ষী। সোভিয়েত নেতা নিকিতা খ্রুশচেভের ক্ষোভ প্রকাশের একটি ঘটনা তখন ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ফিলিপাইনের এক প্রতিনিধির বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে খ্রুশচেভ জুতো খুলে টেবিলে আঘাত করেছিলেন। তবে ঘটনাটির বিভিন্ন বর্ণনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। সোভিয়েত নেতা ওই সময় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেরও তীব্র সমালোচনা করেন।
১৯৬০ সালেই জাতিসংঘের মঞ্চে দীর্ঘতম ভাষণের অন্যতম নজির তৈরি করেন কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। নির্ধারিত ১৫ মিনিটের সময়সীমা ছাড়িয়ে প্রায় ২৬৯ মিনিট বক্তব্য দেন তিনি।
দীর্ঘ এই ভাষণ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হয়ে আছে।
১৯৭৪ সালে ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাত প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন। তখন ফিলিস্তিন জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র ছিল না।
ভাষণে আরাফাত শান্তির প্রতীক হিসেবে জলপাইয়ের ডালের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে অস্ত্রের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তার বক্তব্যে।
২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ জাতিসংঘে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বক্তব্য দেন। পরদিন একই মঞ্চে বক্তব্য দিতে গিয়ে তৎকালীন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ বুশকে ‘শয়তান’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
শাভেজ তার বক্তব্যে আগের দিনের বুশের উপস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও আধিপত্যের কঠোর সমালোচনা করেন।
২০০৯ সালে লিবিয়ার তৎকালীন নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে প্রায় ৯৫ মিনিট কথা বলেন তিনি।
দীর্ঘ বক্তৃতার সময় উপস্থিত কয়েকজনকে ঘুমিয়ে পড়তে দেখে তাদের উদ্দেশেও মন্তব্য করেন গাদ্দাফি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, তার বক্তব্যের সময় অনুবাদকও অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
ভাষণের একপর্যায়ে জাতিসংঘ সনদের একটি কপি ছুড়ে ফেলার ঘটনাও আলোচনায় আসে। পাশাপাশি তিনি নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো ও স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতার সমালোচনা করেন।
২০১১ সালে ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ পশ্চিমা দেশগুলোর নীতির সমালোচনা করে বক্তব্য দেন। তার বক্তব্যের সময় যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা অধিবেশনস্থল থেকে বেরিয়ে যান।
পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দ্বৈত নীতির অভিযোগ তুলে বক্তব্য দেন আহমাদিনেজাদ।
২০১৭ সালে জাতিসংঘে নিজের প্রথম ভাষণে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে ‘রকেট ম্যান’ হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে উত্তর কোরিয়াকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
২০২৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার সময় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুই হাতে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি মানচিত্র তুলে ধরেন।
একটি মানচিত্রকে তিনি ‘আশীর্বাদের মানচিত্র’ এবং অন্যটিকে ‘অভিশাপের মানচিত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেন। মানচিত্র দুটির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের অবস্থান, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং ইরানের ভূমিকা নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন তিনি।
৮১ বছরের ইতিহাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ তাই শুধু কূটনৈতিক আলোচনা নয়, বিশ্ব রাজনীতির নানা নাটকীয় মুহূর্তেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
Muktomon/TA