মাঠ দখল করে বাণিজ্য: নিকুঞ্জের একমাত্র খেলার মাঠে বৈশাখী মেলার অনুমোদন নিয়ে উদ্বেগ


বিশেষ প্রতিনিধি: রাজধানীর নিকুঞ্জ-২ আবাসিক এলাকার শিশু-কিশোরদের একমাত্র খেলার মাঠে ১৫ দিনব্যাপী ‘বৈশাখী মেলা’ আয়োজনের সিদ্ধান্তে এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই মেলায় কল্যাণ সমিতির নাম ব্যবহার করে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র পুরো মাঠ দখলের পরিকল্পনা নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাঠের চারপাশে মেলা আয়োজনের সাজসাজ রব শুরু হওয়ায় বর্তমানে স্থানীয় শত শত শিশুর নিয়মিত খেলাধুলা ও দৌড়ঝাঁপ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছে।
৫ আগস্ট পরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে নিকুঞ্জ-২ কল্যাণ সমিতির কোনো নির্বাচিত বা বৈধ কমিটি নেই। সমিতির কার্যক্রম এখন সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক ইনসান আলীর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসক তার আইনি এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এই মাঠের অনুমোদন দিয়েছেন।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে প্রশাসক ইনসান আলীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে মেলা আয়োজনের বৈধতা বা অনুমোদনের বিষয়ে তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব হয়নি।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই মেলা আয়োজন সম্পূর্ণ অবৈধ বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০-এর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, খেলার মাঠ হিসেবে চিহ্নিত কোনো স্থান অন্য কোনোভাবে ব্যবহার, ভাড়া বা ইজারা দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ। উল্লেখ্য যে, উক্ত আইনের ধারা ৮(১) অনুযায়ী, ৫ নম্বর ধারার বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক ৫ বছরের কারাদণ্ড, অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে শিশুদের খেলার স্থানটি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হস্তান্তর করা স্পষ্টত আইনের লঙ্ঘন, যা এই পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মাঠটি কেবল একটি ফাঁকা জায়গা নয়, বরং এটি স্থানীয় শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের প্রধান কেন্দ্র। বর্তমানে মাঠজুড়ে মেলার স্টল ও বাঁশ-কাঠের স্তূপ দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তরুণ শিক্ষার্থী ইমরান রাজা ও অভিভাবক সাবিনা আক্তার। তাদের মতে, মাঠটি এভাবে বন্ধ করে দেওয়া শিশুদের শৈশব ও স্বাস্থ্যের ওপর এক ধরণের আঘাত।
অতিরিক্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, মাঠের ঠিক পাশেই অবস্থিত নিকুঞ্জ কেন্দ্রীয় মসজিদ ও মাদ্রাসা। বৈশাখী মেলার নামে উচ্চশব্দে গান-বাজনা ও বাণিজ্যিক কোলাহল এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবগাম্ভীর্য ও শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত করতে পারে। এছাড়া ১৫ দিনব্যাপী বহিরাগতদের অবাধ আনাগোনা ও স্টল নির্মাণের ফলে আবাসিক এলাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত যানজট এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ রিয়াদসহ অনেকেই।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বৈশাখী মেলার কথা বলা হলেও এখানে প্রায়ই নিম্নমানের পণ্য ও বিনোদনের আধিক্য থাকে, যা বাঙালি সংস্কৃতির প্রকৃত চেতনার সঙ্গে মানানসই নয়। বর্তমান সরকার যেখানে দেশজুড়ে নতুন নতুন খেলার মাঠ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে একটি প্রভাবশালী মহলের স্বার্থে শিশুদের একমাত্র মাঠটিকে ব্যবসায়িক কেন্দ্রে রূপান্তরের চেষ্টা জনস্বার্থ বিরোধী। কোনো ধরনের গণশুনানি বা স্থানীয়দের মতামত না নিয়ে এমন একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অনৈতিক বলে মনে করছেন বাসিন্দারা।
নিকুঞ্জ-২ একটি পরিকল্পিত ও শান্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত। এলাকাবাসীর দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট—অবিলম্বে এই মেলার অনুমোদন বাতিল করে মাঠটি দখলমুক্ত করতে হবে। শৈশবের অধিকার রক্ষা এবং এলাকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এখনই যথাযথ কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। একটি খেলার মাঠ হারিয়ে গেলে শুধু একটি স্থান নয়, বরং হারিয়ে যাবে পুরো একটি প্রজন্মের সুস্থ শৈশব। তাই এখনই সময় শিশুদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়ার এবং সম্মিলিতভাবে মাঠটিকে রক্ষা করার।



