বৃহত্তর উত্তরা

মাহাদীর বিদায়ে স্তব্ধ নিকুঞ্জ, বাতাসে শুধুই কান্না

বিশেষ প্রতিনিধি: মসজিদের মাইকে বারবার উচ্চারিত হয়েছে তার নাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তার নিষ্পাপ মুখের ছবি। একটি ছোট্ট শিশুর সন্ধানে গত একদিন ধরে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর প্রার্থনায় কেটেছে নিকুঞ্জ, টানপাড়া ও খিলক্ষেত এলাকার মানুষের সময়। সবাই অপেক্ষা করছিলেন একটি সুখবরের জন্য। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হলো এক হৃদয়বিদারক পরিণতিতে।

মঙ্গলবার সকাল থেকে নিখোঁজ থাকা তিন বছর বয়সী শিশু মাহাদী, পিতা মিজানুর রহমান ও মাতা স্মৃতি। দীর্ঘ প্রায় একদিনের উৎকণ্ঠা, অনুসন্ধান ও প্রতীক্ষার পর বুধবার বিকেল ৫টার দিকে নিকুঞ্জ-১ এর খেলার মাঠ সংলগ্ন জামতলা এলাকার একটি উন্মুক্ত জলাশয় থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মাহাদীর পৈতৃক বাড়ি বরগুনা জেলায়।

শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই পুরো নিকুঞ্জ, টানপাড়া ও খিলক্ষেত এলাকাজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক খোঁজাখুঁজি। স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে সম্ভাব্য সব স্থানে অনুসন্ধান চালান। মসজিদের মাইকে বারবার ঘোষণা দেওয়া হয়। নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচার করা হয় মাহাদীর ছবি, পরিচয় এবং সন্ধান চেয়ে বার্তা। এলাকাবাসীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং শিশুটির নিরাপদ ফিরে আসার জন্য দোয়া করেন।

একটি শিশুকে ঘিরে এমন মানবিক উদ্যোগে যেন পুরো এলাকাই এক পরিবারের রূপ নিয়েছিল। মানুষের মুখে মুখে ছিল একটাই নাম—মাহাদী। সবাই বিশ্বাস করতে চেয়েছিলেন, হয়তো কোনো অলৌকিকভাবে সে ফিরে আসবে তার মায়ের কোলে।

কিন্তু বুধবার বিকেলে সেই আশার আলো নিভে যায়। নিকুঞ্জ-১ এর খেলার মাঠ সংলগ্ন জামতলা এলাকার উন্মুক্ত জলাশয়ে শিশুটির মরদেহ পাওয়া যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন শত শত মানুষ। স্বজনদের আহাজারি আর এলাকাবাসীর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। যে শিশুটির সন্ধানে গত একদিন ধরে সবাই প্রার্থনা করেছিলেন, তাকে নিথর অবস্থায় দেখে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন উপস্থিত মানুষজন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত অনেক স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেন, শিশুটির মরদেহের অবস্থা এবং আশপাশের পরিস্থিতি দেখে তাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে সন্দেহজনক মৃত্যু বলেও মন্তব্য করেন। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

এ ব্যাপারে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাব আল হোসাইন বলেন, “ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আইনগত কার্যক্রম শুরু করেছে। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, আলামত সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে কোনো বিষয়কেই গুরুত্বহীনভাবে দেখা হচ্ছে না। যদি কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

এ ব্যাপারে এলাকার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির আহ্বায়ক জাহিদ ইকবাল বলেন, “গতকাল সকাল থেকে মাহাদীর খোঁজে যে দৃশ্য আমরা দেখেছি, তা আমাদের সমাজের মানবিক শক্তির এক বিরল উদাহরণ। একটি শিশুর সন্ধানে পুরো নিকুঞ্জ, টানপাড়া ও খিলক্ষেত যেন এক পরিবারের মতো এক হয়ে গিয়েছিল। মসজিদের মাইক থেকে বারবার ঘোষণা হয়েছে, তরুণরা দল বেঁধে বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো মানুষ তার ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে দিয়েছেন। দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ ফোন করে শিশুটির খোঁজ জানতে চেয়েছেন। সবাই চেয়েছিল, মাহাদী সুস্থভাবে ফিরে আসুক।”

তিনি আরও বলেন, “আজ যখন শুনলাম মাহাদী আর নেই, তখন সত্যিই ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। একজন সাংবাদিক হিসেবে বহু হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হয়েছি, কিন্তু একটি নিষ্পাপ শিশুকে ঘিরে এত মানুষের ভালোবাসা, প্রার্থনা ও আশার পর এমন সংবাদ মেনে নেওয়া খুবই কঠিন। মাহাদীর মায়ের বুকফাটা কান্না, বাবার নির্বাক বেদনা এবং স্বজনদের আহাজারি দেখে নিজেকেও আর ধরে রাখতে পারিনি। মনে হয়েছে, যেন পুরো এলাকাই নিজের সন্তানকে হারিয়েছে। আমরা চাই এই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হোক। যদি এর পেছনে কোনো অপরাধ লুকিয়ে থাকে, তবে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।”

গত একদিন ধরে মাহাদীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিকুঞ্জ, টানপাড়া ও খিলক্ষেত এলাকার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল। একটি শিশুর সন্ধানে মানুষের যে ভালোবাসা, উদ্বেগ ও মানবিক সংহতি দেখা গেছে, তা ছিল অনন্য। কিন্তু সেই গল্পের শেষ অধ্যায়টি লেখা হলো গভীর বেদনা দিয়ে।

যে মাহাদীর হাসিতে মুখর থাকার কথা ছিল একটি ঘর, সে আজ নিথর। যে মা সন্তানের ফিরে আসার আশায় বারবার দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তার বুক আজ শোকে বিদীর্ণ। যে বাবা সন্তানের খোঁজে ছুটে বেড়িয়েছেন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, তিনি আজ নির্বাক। আর পুরো নিকুঞ্জ-খিলক্ষেতবাসীর হৃদয়ে আজ একটাই প্রশ্ন—কেন এভাবে থেমে গেল ছোট্ট মাহাদীর জীবন?

এলাকাবাসীর দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হোক। কারণ মাহাদীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, এটি সমগ্র সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়া এক বেদনাদায়ক ঘটনা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button