আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে নতুন করে সামরিক সংঘাতে জড়ানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ইসরায়েল। অন্যদিকে, ইরানে পুনরায় হামলা চালানোর সম্ভাব্য সামরিক বিকল্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তুলে ধরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকায় নতুন করে যুদ্ধ শুরুর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথের বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের জন্য আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক—উভয় ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত মূলত ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে এক বৈঠকে ইরানে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের বিভিন্ন বিকল্প তুলে ধরেন সেন্টকম প্রধান ব্র্যাড কুপার। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। তবে বৈঠকে নতুন করে হামলা শুরুর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
হামলার সম্ভাব্য পথ অনুশীলন ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমটির দাবি, সম্ভাব্য অভিযানের প্রস্তুতি এখন আর কেবল পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইসরায়েলি বিমানবাহিনী সিরিয়া ও ইরাকের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানের সীমান্তের দিকে কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান নিয়ে একাধিক মহড়া চালিয়েছে।
এসব মহড়ায় সম্ভাব্য হামলার পথ ও সামরিক সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১০টি সামরিক পরিবহন বিমান ইসরায়েলের বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেছে বলে জানিয়েছে দ্য টাইমস অব ইসরায়েল। উন্মুক্ত ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব বিমানে কী ধরনের সামরিক সরঞ্জাম আনা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো এবং আঞ্চলিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী টেক্সাস থেকে একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে বলেও সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে।
নির্বাচনের পর হামলার আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে এবিসি নিউজ।
২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ইসরায়েলি ও মার্কিন সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য যৌথ হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে। তবে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাবে না।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও জানিয়েছে, নির্বাচনের পর সম্ভাব্য হামলা এবং ইরানের পাল্টা আঘাত মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ও আঞ্চলিক মিত্রকে প্রস্তুত থাকতে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন। তবে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।
ইরানের কঠোর পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি
সম্ভাব্য নতুন মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশটির সশস্ত্র বাহিনীকে যেকোনো হামলার তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
রয়টার্সের ৩১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের নিরাপত্তা ও সামরিক নেতৃত্ব নতুন সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠি তেহরান পেয়েছে এবং সেটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে সরাসরি আলোচনার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে, ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই বলেছেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির নীতিও পুনর্বিবেচনার প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
কাতারের মধ্যস্থতায় চলছে কূটনৈতিক তৎপরতা
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতা করছে কাতার।
রয়টার্স জানিয়েছে, ৩০ অক্টোবর তেহরানে ১২ ঘণ্টার বেশি আলোচনার পর ৩১ অক্টোবর ইরানি প্রতিনিধিরা দোহায় কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাতের অবসান এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পথ তৈরি করা।
কাতার এর আগে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা তৈরির জন্য সাত দিনের একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে ইরান প্রস্তাবটিকে অপর্যাপ্ত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আলোচনায় ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ ছাড়, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে মতবিনিময় হচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ট্রাম্প এখনো সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি এবং কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তবে প্রয়োজন হলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের অন্যতম উদ্বেগের জায়গা হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবাহিত হয়।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছে সমুদ্র মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় তিনটি তেলবাহী জাহাজে আগুন ধরে যায়। তবে এসব মাইন কারা পেতেছিল এবং ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা কত, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ পরিস্থিতিতে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
লেবাননেও ছড়িয়ে পড়তে পারে সংঘাত
ইসরায়েলি সূত্রগুলোর আশঙ্কা, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ সংঘাতে যোগ দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইসরায়েলকে একই সঙ্গে একাধিক фронটে সামরিক চাপ মোকাবিলা করতে হতে পারে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন আঞ্চলিক কূটনীতিকরা।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো ট্রাম্পের হাতে
ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য কী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও সামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালালেই দেশটির সরকারের নীতি পরিবর্তন হবে কিংবা রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ইসরায়েলের উদ্বেগ, কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো চুক্তি হলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও অন্যান্য সামরিক কার্যক্রমের বিষয়গুলো অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, একদিকে ইসরায়েলের সামরিক প্রস্তুতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা, অন্যদিকে ইরানের পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি এবং কাতারের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক আলোচনা—সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে ১ নভেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নতুন করে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। ফলে আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প কোন পথে এগোন, সেটিই এখন পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক।