মুক্তমন রিপোর্টার : ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলার মধ্যে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হুথিদের মোকাবিলায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মাধ্যমে ইসরায়েলের কাছ থেকে গোয়েন্দা সহায়তা চেয়েছে।
তবে সৌদি আরব বা ইসরায়েল—কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। ফলে বিষয়টি এখনো মূলত বিভিন্ন সূত্রনির্ভর প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, লোহিত সাগর উপকূল, কৌশলগত দ্বীপ এবং সৌদি আরবের শহর, বিমানঘাঁটি ও জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে হুথিদের তৎপরতা নিয়ে রিয়াদ উদ্বিগ্ন। এ পরিস্থিতিতে হুমকি শনাক্তকরণ, নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্যের ক্ষেত্রে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইসরায়েলের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ, সৌদি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন কিংবা হুথিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বিমান হামলার কথা বলা হয়নি।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটিকে তিন দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে।
চুক্তির প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠক ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সৌদি আরবে একটি সচিবালয় স্থাপন এবং রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা পর্যায়ে সমন্বয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চুক্তির কার্যকর কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিস্তারিত বিষয় এখনো বিকাশমান বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
ফলে হুথিদের চলমান হামলার মতো তাৎক্ষণিক সংকটে এই নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো কতটা দ্রুত কার্যকর করা সম্ভব—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সৌদি আরব যদি সত্যিই ইসরায়েলের কাছ থেকে সহযোগিতা চেয়ে থাকে, তাহলে সেটি সরাসরি সামরিক জোট সক্রিয় করার চেয়ে ভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ। গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও হুমকি শনাক্তকরণে সহযোগিতা তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং রাজনৈতিকভাবে কম দৃশ্যমান একটি ব্যবস্থা হতে পারে।
ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও নজরদারি সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি পর্যবেক্ষণে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। অন্যদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা সম্পর্ক থাকলেও লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে তাদের সক্ষমতা ও প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ভিন্ন প্রকৃতির।
এ কারণে সৌদি আরবের সম্ভাব্য এই যোগাযোগকে মক্কা চুক্তি বাতিল বা অকার্যকর হয়ে যাওয়ার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার আগে দুই ধরনের সহযোগিতার পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
হুথিদের সামরিক তৎপরতার কারণে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব ও এডেন উপসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কাও রিয়াদের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় নতুন চাপ তৈরি করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব শুধু একটি দেশের ওপর নির্ভর না করে ব্রিটেন, মিসর এবং উপসাগরীয় অন্যান্য দেশসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে তুরস্কের সঙ্গেও রিয়াদের কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। তবে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার ক্ষেত্রে তুরস্ক ও পাকিস্তানের নিজস্ব কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিবেচনা রয়েছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক রয়েছে। তুরস্কও ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। ফলে ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক ভূমিকা নেওয়া উভয় দেশের জন্যই আলাদা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাবের বিষয় হতে পারে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ফলে সৌদি-ইসরায়েল প্রকাশ্য সামরিক সহযোগিতায় পাকিস্তানের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে আরও জটিল হতে পারে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি এখনো নতুন। এর কার্যকর কাঠামো, যৌথ মহড়া, প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা।
তাই বর্তমান সংকটে সৌদি আরব ইসরায়েলের কাছ থেকে গোয়েন্দা সহযোগিতা চাইছে—এমন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পুরো মক্কা চুক্তির কার্যকারিতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে চুক্তিটির পরবর্তী বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
সবশেষে, সৌদি আরব ও ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার না করা পর্যন্ত ইসরায়েলি গোয়েন্দা সহায়তার খবরকে নিশ্চিত তথ্যের পরিবর্তে সূত্রনির্ভর প্রতিবেদন হিসেবেই বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত।
সূত্র: রয়টার্স, দ্য জেরুজালেম পোস্ট, মিডল ইস্ট মনিটর
Muktomon/TA