ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় নতুন করে নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে সৌদি আরব। বাব আল-মানদেব প্রণালীর আশপাশের কৌশলগত এলাকায় হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের ফলে সৌদি তেল রপ্তানি ও লোহিত সাগরের নৌপথ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে পশ্চিমা, আঞ্চলিক ও ইয়েমেনি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হুথিদের এই অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, কমান্ড কাঠামোর দুর্বলতা, সীমিত বিমান সহায়তা এবং হুথিদের সামরিক প্রস্তুতিকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে না পারা।
এক কূটনীতিকের দাবি, হুথিরা গোপনে বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা প্রস্তুত করেছিল। তাদের এই প্রস্তুতি সম্পর্কে সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো পর্যাপ্ত ধারণা করতে পারেনি।
লন্ডনভিত্তিক চাথাম হাউসের ফেলো নিল কুইলিয়াম এই ঘটনাকে সৌদি পক্ষের বড় ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইয়েমেনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফারিয়া আল-মুসলিমীও বলেছেন, সৌদি আরব ইয়েমেনে অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়েছে।
সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর পিছু হটার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সরবরাহ করা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম হুথিদের হাতে চলে গেছে বলে আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব অস্ত্র হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিপক্ষের ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জাম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুলখালেক আব্দুল্লাহ দাবি করেছেন, ইয়েমেন সরকারের বাহিনী হুথিদের অগ্রযাত্রার মুখে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।
হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের কোনো দেশই সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত নয়।
এমনকি সৌদি নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা উদ্যোগেও ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের সরাসরি অংশগ্রহণ দেখা যায়নি।
তবে এসব বিষয়ে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে রয়টার্সকে কোনো মন্তব্য দেওয়া হয়নি।
ওয়াশিংটনের সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে অনাগ্রহের পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মিসরের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করতে কায়রো সফর করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুটি আঞ্চলিক সূত্রের দাবি, লোহিত সাগরকেন্দ্রিক অভিযানে মিসরকে যুক্ত করতে চায় সৌদি আরব। ২০১৫ সালে ইয়েমেন সংঘাতে বাব আল-মানদেব এলাকায় সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানে মিসরের নৌ ও বিমান বাহিনী অংশ নিয়েছিল।
তবে এবার মিসর সৌদির অনুরোধে সামরিকভাবে যুক্ত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বাব আল-মানদেবের আশপাশের এলাকায় হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের ফলে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ও সৌদি তেল রপ্তানি ব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য চাপ তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেন ও আফ্রিকার জিবুতি-ইরিত্রিয়া উপকূলের মাঝের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলটির ওপর প্রভাব বাড়লে হুথিদের রসদ ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সক্ষমতাও বাড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রভাব যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ ঘিরে নতুন ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
সৌদি আরবের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—হুথিদের দখল করা অবস্থান ধরে রাখার সুযোগ দেওয়া, নাকি বড় ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানো।
উপসাগরীয় এক কর্মকর্তার মতে, হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ না নিলে সৌদি আরব ভবিষ্যতে তাদের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল অবস্থায় পড়তে পারে। আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালে সৌদি ভূখণ্ডে পাল্টা হামলার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
সাবেক মার্কিন মধ্যস্থতাকারী ডেনিস রসের দাবি, হুথিরা হুদাইদাহ বন্দর ও সানা বিমানবন্দরের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রতি সৌদি সমর্থন কমানোর মতো দাবি তুলছে।
হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই প্রভাবিত করছে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও তার মিত্রদের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর সংঘাত মোকাবিলায় মনোযোগী থাকলেও হুথিরা লোহিত সাগর ও ইয়েমেনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ পেয়েছে।
ফলে ইয়েমেন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি আরব কতটা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবে এবং হুথিদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো পথ তৈরি হবে কি না—সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
Muktomon/TA