মত প্রকাশ

নাগরিক সাংবাদিকতা ও ‘তাজু ভাই’: অবহেলিত জনপদের এক অস্ফুট স্বর

২০১৬ সালের কথা। দেশে তখন স্মার্টফোনের বিপ্লব শুরু হলেও ‘মোবাইল সাংবাদিকতা’ বা ‘মোজো’ (MoJo) ধারণাটি সাধারণ মানুষের কাছে তো বটেই, অনেক গণমাধ্যমকর্মীর কাছেও ছিল অপরিচিত। সেই সময়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় পাতায় মোবাইল সাংবাদিকতা নিয়ে যখন কলাম লিখেছিলাম, তখন মূল লক্ষ্য ছিল এটি বোঝানো যে—সংবাদ কেবল পেশাদার সাংবাদিকদের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। প্রযুক্তির কল্যাণে সাধারণ মানুষও এখন সংবাদের বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে।

আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, সেই ধারণা কেবল সত্যই হয়নি, বরং তা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বিশাল প্রভাব ফেলছে। মোবাইল সাংবাদিকতার অন্যতম একটি শক্তিশালী শাখা হলো ‘নাগরিক সাংবাদিকতা’। যেখানে একজন সাধারণ মানুষ তার হাতের স্মার্টফোনটি দিয়ে চারপাশের অনিয়ম, অভাব কিংবা সংবাদের উপাদানকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন। আজকের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেসবুক সংবাদের একটি বড় ‘সোর্স’ বা উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় ফেসবুকে সাধারণ মানুষের দেওয়া একটি পোস্টই সংবাদপত্রের প্রধান শিরোনাম হয়ে ওঠে।

সম্প্রতি এই নাগরিক সাংবাদিকতার এক বিচিত্র ও আলোচিত উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার এক যুবক—তাজুল ইসলাম, যাকে সবাই এখন ‘তাজু ভাই’ নামে চেনেন।

ঘটনার সূত্রপাত গত স্বাধীনতা দিবসে। জিলাপির দাম নিয়ে অনেকটা সংবাদ উপস্থাপনার ঢঙে একটি ভিডিও করে তা ফেসবুকে পোস্ট করেন তাজু। ভিডিওটি প্রকাশের পরপরই তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভাইরাল’ হয়ে যান। তবে এই ভাইরাল হওয়ার পেছনে ইতিবাচক প্রশংসার চেয়ে নেতিবাচক সমালোচনা বা ‘ট্রোলিং’ ছিল বেশি। এক শ্রেণির মানুষ তার অগোছালো উপস্থাপনা, আঞ্চলিক টান মিশ্রিত ভাষা এবং ব্যাকরণহীন সংবাদ শৈলী দেখে তাকে নিয়ে বিদ্রূপ শুরু করেন। কেউ কেউ এমন মন্তব্যও করেন যে, ‘সাংবাদিকতা আজ কতটা নিচে নেমে গেছে!’

কিন্তু প্রশ্ন জাগে—তাজু কি নিজেকে কখনো সাংবাদিক হিসেবে দাবি করেছেন? উত্তর হলো, না। ভাইরাল হওয়ার পর যখন মূলধারার গণমাধ্যমগুলো তার পিছু নিল, তখন বেরিয়ে এল এক অন্যরকম করুণ এবং অনুপ্রেরণামূলক গল্প।

তাজুল ইসলাম পেশায় একজন নির্মাণশ্রমিক। রাজধানী ঢাকায় হেল্পার হিসেবে কাজ করে আট সদস্যের অভাবী সংসার টানেন তিনি। তার বাবা-মা দুজনেই শারীরিক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী। পরিবারের এই হাড়ভাঙা খাটুনি আর দারিদ্র্যের কষ্ট ভুলে থাকতেই তিনি মূলত শখের বশে ভিডিও করা শুরু করেছিলেন। তবে তার ভিডিওর পেছনে একটি গভীর দর্শন কাজ করে, যা হয়তো অনেক তথাকথিত শিক্ষিত বা পেশাদার সাংবাদিকের মধ্যেও অনুপস্থিত।
তাজুল ইসলামের কথায় ফুটে উঠেছে সেই তিক্ত সত্য— “আপনারা সাংবাদিকরা আমাদের নারায়ণপুরের মতো চরাঞ্চলে আসেন না। আমাদের এলাকার খবর কেউ করেন না। আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই আমি ভিডিও করি। আমি বোকাসোকা মানুষ, আমার ভুল হতেই পারে। আপনারা আমাকে নিয়ে ট্রল করেন, তাতে আমার কষ্ট নেই; আমি চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক।”

একজন নির্মাণশ্রমিক হয়েও তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, তার এলাকার ভাঙা রাস্তা, অবহেলিত জনপদ এবং মানুষের দুরাবস্থা তুলে ধরার জন্য মিডিয়ার আলো দরকার। আর সেই আলো কাড়ার জন্যই তিনি নিজের মতো করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। এটিই নাগরিক সাংবাদিকতার মূল শক্তি। তিনি যে অগোছালো ও অশুদ্ধ ভাষায় কথা বলছেন, তা আসলে চরাঞ্চলের মানুষের অকৃত্রিম কণ্ঠস্বর। তথাকথিত শুদ্ধ ভাষার চেয়েও এই ‘অশুদ্ধ’ আকুতি অনেক বেশি শক্তিশালী।

বর্তমানে তাজু ভাইয়ের ফেসবুক পেজ ‘তাজু ভাই ২.০’-তে প্রায় ৮৮ হাজার অনুসারী রয়েছে। তার একটি ভিডিও প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছেছে। সমালোচনা কিংবা বিদ্রূপ তাকে দমাতে পারেনি। বরং তিনি এখন স্বপ্ন দেখেন, তার এই ভিডিওগুলোর মাধ্যমেই একদিন রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নজরে আসবে চরাঞ্চলের দুর্দশা।

তাজু ভাইদের এই প্রচেষ্টাকে শুধু ‘বিনোদন’ বা ‘নিম্নমানের কাজ’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। যারা তার সাংবাদিকতার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন—প্রান্তিক জনপদের এই মানুষগুলোর কথা কি আমরা মূলধারার সংবাদে যথাযথভাবে তুলে ধরছি? যদি ধরতাম, তবে একজন তাজু ভাইকে মাইক্রোফোন হাতে তুলে নিতে হতো না।

সবশেষে বলা যায়, মোবাইল সাংবাদিকতা কেবল পেশাদারদের হাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রান্তিক মানুষের কথা বলার অস্ত্র। তাজু ভাই হয়তো সাংবাদিক নন, কিন্তু তিনি একজন অকুতোভয় ‘কমিউনিটি ভয়েস’। তার ভিডিওর ভিউ বা লাইক সংখ্যা বড় কথা নয়; বরং সেই ভিডিওর পেছনের উদ্দেশ্যটি মহান। নাগরিক সাংবাদিকতার এই জোয়ারে তাজু ভাইদের মতো মানুষেরা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন যে—সাহস থাকলে এবং উদ্দেশ্য সৎ থাকলে অতি সাধারণ স্মার্টফোন দিয়েও অনেক বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

লেখক : সংবাদকর্মী, কলামিস্ট ও লেখক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button