মুক্তমন ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) তৃতীয়বারের মতো একটি যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব পাস হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে ২২০-২০৪ ভোটে পাস হওয়া প্রস্তাবটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে বাধা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে।
এর আগে গ্রীষ্মে একই ধরনের আরও দুটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে কোনো প্রস্তাবই এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছায়নি। কংগ্রেসে পাস হলেও ট্রাম্প এমন প্রস্তাবে ভেটো দেবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবটি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি শেঠ মোল্টন বলেন, কংগ্রেসের উচিত সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তোলা এবং নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তের কাছে নতিস্বীকার না করা।
অন্যদিকে, ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি ও হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান ব্রায়ান মাস্ট প্রশ্ন তোলেন, ডেমোক্র্যাটরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোন সামরিক সক্ষমতা সরিয়ে নিতে চান। তার বক্তব্য, ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি তৈরি করছে।
মাস্ট বলেন, ট্রাম্প ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ বিরোধী এবং ইরানকে ঘিরে কয়েক দশকের সংঘাতের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চলমান হুমকি।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে শেষ যুদ্ধক্ষমতা ভোট
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রতিনিধি পরিষদে ইরান যুদ্ধ নিয়ে এটিই শেষ ভোট হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনী প্রচারণাতেও যুদ্ধটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর প্রায় সাত মাস ধরে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। এ সময়ে দফায় দফায় ক্ষয়ক্ষতিসহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা-পাল্টা হামলা হয়েছে, যার প্রভাব পুরো অঞ্চলেই পড়েছে।
আইনপ্রণেতারা চলতি সপ্তাহের শেষে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে প্রায় পুরো সময় নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হবেন। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন। নির্বাচনের আর ৫০ দিনেরও কম সময় বাকি।
এদিকে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল পরিবহনে সংঘাতের প্রভাব পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দামসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্য নিয়েও চাপ তৈরি হয়েছে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (CBO) মঙ্গলবার জানিয়েছে, ১ আগস্ট পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। সংঘাতের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে প্রতি মাসে আরও ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে বলে সংস্থাটি হিসাব দিয়েছে।
CBO-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রভাবে ২০২৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি আগের প্রত্যাশার তুলনায় ০.৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি হতে পারে।
রিপাবলিকানদের মধ্যেও ভিন্নমত
দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি যুদ্ধে জড়াবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ইরানের বিরুদ্ধে তার সামরিক পদক্ষেপ এখন রিপাবলিকান পার্টির জন্যও রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে দলটি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
জুলাইয়ে পরিচালিত AP-NORC-এর একটি জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ইরানের যুদ্ধ চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সার্থক হয়নি।
এর আগে প্রতিনিধি পরিষদের যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগগুলোতে চারজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিয়েছিলেন। মঙ্গলবারের ভোটে সেই সংখ্যা বেড়ে সাতজনে দাঁড়ায়।
তাদের মধ্যে আইওয়ার নির্বাচনীভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রতিনিধি জ্যাক নান ও মারিয়্যানেট মিলার-মিকস রয়েছেন। এ ছাড়া মিশিগানের টম ব্যারেট, ওহাইওর ওয়ারেন ডেভিডসন, পেনসিলভানিয়ার ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক, কেনটাকির থমাস ম্যাসি এবং দক্ষিণ ক্যারোলিনার অবসরপ্রত্যাশী প্রতিনিধি ন্যান্সি মেস প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন।
হাউসের সব ডেমোক্র্যাট সদস্যও যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
যুদ্ধ পরিচালনায় কংগ্রেসের ক্ষমতার পরীক্ষা
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের গতিপথে প্রভাব রাখার জন্য কংগ্রেস একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট প্রস্তাবগুলোতে বাধা দিতে বা ভেটো দিতে পারায় ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক অভিযান সীমিত করার প্রচেষ্টার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।
জুনে প্রতিনিধি পরিষদ প্রথম যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব পাস করে। জুলাইয়ে দ্বিতীয়বার একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উভয় প্রস্তাবের লক্ষ্য ছিল ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান বন্ধ করা।
সিনেটেও যুদ্ধ বন্ধে যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ১০ম প্রচেষ্টায় পাস হয়েছিল। কিন্তু পরদিন ট্রাম্পের সমালোচনার পর রিপাবলিকান সিনেটররা অবস্থান পরিবর্তন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্টেরও নির্দিষ্ট সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা রয়েছে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর প্রণীত ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতার ওপর আরও নির্দিষ্ট সীমা আরোপের চেষ্টা করে। আইনে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে ৬০ বা ৯০ দিনের পর কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়েও আলোচনা
হাউস স্পিকার মাইক জনসন মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানো প্রয়োজন।
তবে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত একটি ‘নতুন পর্যায়ে’ প্রবেশ করছে এবং মিত্ররা অঞ্চলটিকে স্থিতিশীল করতে আরও সক্রিয় হচ্ছে।
জনসনের বক্তব্য, পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে জ্বালানির দাম আবার কমবে এবং এর সঙ্গে মুদি পণ্যের দামও কমতে পারে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের প্রত্যাশা অনুযায়ী এ পরিবর্তন নির্বাচনের পর হতে পারে। তবে তার নিজের ইচ্ছা, এটি যেন আজই ঘটে।