পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অডিট আপত্তি শূন্যে নামানোর নির্দেশ ইউজিসির

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কর্মশালায় বক্তব্য দিচ্ছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কর্মশালায় বক্তব্য দিচ্ছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অডিট আপত্তির সংখ্যা শূন্য পর্যায়ে নামিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।

পুরোনো অডিট আপত্তি ধাপে ধাপে নিষ্পত্তির পাশাপাশি নতুন করে যাতে কোনো আপত্তি সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ইউজিসি অডিটোরিয়ামে ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ইউজিসি চেয়ারম্যান।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর অডিট আপত্তির সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছর এ বৃদ্ধির হার গত বছরের তুলনায়ও বেশি। এসব বিষয় প্রকাশ্যে এলে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, ইউজিসির বর্তমান লক্ষ্য হলো অডিট আপত্তি শূন্য পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। পুরোনো আপত্তি একদিনে নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি ধীরে ধীরে সেগুলো কমানোর পাশাপাশি নতুন আপত্তি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেন।

ইউজিসি চেয়ারম্যানের মতে, অডিট আপত্তির অন্যতম কারণ সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিমালা (পিপিআর) ও আর্থিক বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করা। ক্রয় কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পিপিআর বিষয়ে প্রশিক্ষিত ও সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে এ ক্ষেত্রে ইউজিসি সহযোগিতা করবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংজ্ঞাগতভাবে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রশাসনিক, একাডেমিক ও আর্থিক স্বাধীনতা থাকা উচিত। তবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাস্তবে মূলত একাডেমিক স্বাধীনতা ভোগ করলেও প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা সবসময় কার্যকর থাকে না।

তিনি বলেন, আর্থিক স্বাধীনতার সঙ্গে নিজস্বভাবে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতার পাশাপাশি সরকারের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ আইন ও বিধিবিধান মেনে ব্যয় এবং ব্যয়ের যথাযথ হিসাব উপস্থাপনের বিষয়টি জড়িত।

সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ইউজিসি সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে উল্লেখ করে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নতুন কোনো নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য ইউজিসির নেই। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে সরকারের আইন ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে চায় কমিশন।

নিয়োগ, পদোন্নতি ও সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও নিয়ম মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। অতীতের অনিয়ম থেকে তৈরি জটিলতা নিয়মের মধ্যে থেকে সমাধানের চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি ভবিষ্যতে নতুন অনিয়ম না করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

জনবল নিয়োগের আগে প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে যাচাই করে তথ্য-উপাত্তসহ প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ২০২৩ সালে নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হলেও ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও তারা সেই নিয়োগ দিতে পারেনি। এর মাধ্যমে আগের প্রয়োজন নির্ধারণে ত্রুটির বিষয়টি স্পষ্ট হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যৌক্তিক প্রস্তাব ও যথাযথ তথ্য-উপাত্ত দিলে কমিশন তা দ্রুত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে।

উচ্চশিক্ষার রূপান্তরে ইউজিসির কৌশলগত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে বর্তমান বাজেট বা উন্নয়ন বরাদ্দের কাছাকাছি কিংবা তার চেয়েও বেশি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে সরকার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি আস্থা বাড়বে। পাশাপাশি জনগণের কাছেও সেই আস্থা দৃশ্যমান করা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে ইউজিসির সমন্বয় বাড়াতে প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা এবং সরকারি নিয়মকানুন নিয়ে মতবিনিময়ের কথা জানান তিনি। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ডিজিটাল সংযোগ তৈরির কাজও চলছে বলে জানান ইউজিসি চেয়ারম্যান।

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আসলাম হোসেন। তিনি জানান, দেশে ৬০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত হয়েছে, যার মধ্যে ৫৭টির কার্যক্রম চলমান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সরকারের অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনে কর্মশালাটি সহায়ক হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মাছুমা হাবিব ও অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন ইউজিসির সচিব ড. মো. ফখরুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে ৩০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, অর্থ ও হিসাব বিভাগের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। এ ছাড়া ইউজিসির অর্থ, হিসাব ও বাজেট বিভাগের কর্মকর্তারা বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক সেশন পরিচালনা করেন।

Muktomon/TA