মুক্তমন রিপোর্ট : দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং অর্থনীতিতে মূল্য সৃষ্টির চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের যৌথ গবেষণা, গবেষণার ফল বাণিজ্যিকীকরণ, পেটেন্ট এবং সক্ষম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবনকেন্দ্র বা ইনকিউবেশন হাব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নভোথিয়েটারে আয়োজিত বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার-২০২৬-এর ‘উদ্ভাবনের চালিকাশক্তি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় সভাপতির বক্তব্যে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এসব কথা বলেন।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, সরকারের লক্ষ্য জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা। এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্ভাবনের কেন্দ্র এবং অর্থনীতিতে মূল্য সৃষ্টির কার্যকর অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে উচ্চশিক্ষায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে ইউজিসি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে নতুন নতুন উদ্ভাবনী ধারণা দেখা গেছে। এসব ধারণাকে বাণিজ্যিকীকরণের পর্যায়ে নিতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
প্রচলিত ব্যবস্থা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্যান্য দেশের মডেল অনুসরণ না করে বাংলাদেশের বাস্তবতা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সামাজিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এ পরিবর্তন আনা হবে।
মামুন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটি কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালনা করা প্রয়োজন। বর্তমানে কোথাও প্রযুক্তি হস্তান্তর কার্যালয়, কোথাও ইনকিউবেশন হাবসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী শুধু ডিগ্রি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হবেন না; মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষতার পাশাপাশি অর্থনীতিতে মূল্য সৃষ্টি করতে পারে—এমন ধারণা ও পরিকল্পনা নিয়েও বের হবেন।
ইউজিসি চেয়ারম্যান জানান, সক্ষম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবনকেন্দ্র বা ইনকিউবেশন হাব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কেন্দ্রে নতুন ধারণা বাস্তবায়নে সহায়তা এবং উদ্যোক্তা তৈরির কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে উদ্ভাবন ও গবেষণা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
গোলটেবিল আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের যৌথ গবেষণায় অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব উঠে আসে। শিল্প, সমাজ ও অর্থনীতির বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে যৌথ গবেষণা প্রকল্প ও গবেষণাগার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গবেষণার ফল শুধু গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে পেটেন্ট, পণ্য উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে গবেষণাপত্র প্রকাশের পাশাপাশি পেটেন্ট, উদ্ভাবনের বাণিজ্যিক ব্যবহার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন বিবেচনার প্রস্তাবও আলোচনায় আসে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নতুন ধারণা বাস্তবায়নে সহায়তা, তাঁদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে একাডেমিক স্বীকৃতি, পাঠ্যক্রম প্রণয়নে শিল্প খাতকে সম্পৃক্ত করা, শিল্প খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ এবং দক্ষতাভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি কোর্স চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
উদ্ভাবন ও গবেষণায় সরকারি অর্থায়ন বৃদ্ধি, জাতীয় গবেষণার জন্য তথ্যকেন্দ্র ও তথ্যভান্ডার তৈরি এবং বৈশ্বিক অংশীদারত্ব বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পেটেন্ট পাওয়ার জটিলতা কমাতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি পরিষদ গঠনের প্রস্তাবও আসে।
প্রথম ধাপে পাঁচ থেকে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবন ও সমাধানভিত্তিক কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খানের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. উম্মে সালমা জোহরাসহ ইউজিসি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, এপিইউবি, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিসিক, বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি, ব্র্যাক, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ ও স্টার্টআপ বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
Muktomon/TA