কঠোর অভিবাসন নীতি

কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর তালিকায় ৯৬৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক

File Photo
File Photo

মুক্তমন ডেস্ক : কানাডায় অবৈধভাবে অবস্থানকারী ও আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশিদের ওপরও। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির (সিবিএসএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশটি থেকে অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ৯৬৮ জন বাংলাদেশি।

৩০ জুন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর তালিকায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারত। দেশটির ৭ হাজার ৬৬৯ জন নাগরিককে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এরপর রয়েছে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, নাইজেরিয়া ও পাকিস্তান।

সিবিএসএর তথ্য বলছে, ২০২০ সালে কানাডা থেকে ৩০৮ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। করোনা মহামারিসহ বিভিন্ন কারণে পরবর্তী সময়ে এ সংখ্যা ওঠানামা করলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ২২৭ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা মোট বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ৪০ হাজার ৮২৭। তাদের মধ্যে প্রায় ৩৬ হাজার ৬২২ জন রাজনৈতিক আশ্রয় বা শরণার্থী হিসেবে আবেদন করেছিলেন।

কেন কঠোর হচ্ছে কানাডা?

সংশ্লিষ্টদের মতে, কানাডায় আশ্রয় আবেদনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে যাচাই-বাছাই আরও কঠোর হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশটির নাগরিকদের করা আশ্রয় আবেদনের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

আগে যারা রাজনৈতিক নিপীড়ন বা মামলার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে কানাডায় আশ্রয় চেয়েছিলেন, তাদের দাবির বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন করে অনেকে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করে আশ্রয়ের আবেদন করছেন।

এ ছাড়া ভ্রমণ বা ভিজিটর ভিসায় কানাডায় গিয়ে পরবর্তীতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করার ঘটনাও কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। ফলে আবেদনকারীদের দেওয়া তথ্য ও দাবির সত্যতা যাচাইয়ে কানাডার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

মিথ্যা তথ্য, অসত্য নথি বা ভিত্তিহীন দাবি প্রমাণিত হলে আবেদন প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

ইউরোপেও বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনে কঠোরতা

শুধু কানাডা নয়, ইউরোপের দেশগুলোতেও বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন নিয়ে কঠোর যাচাই-বাছাই চলছে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম বড় উৎস বাংলাদেশ। ওই বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে ৩৬ হাজার ৯০১টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে।

তবে এসব আবেদনের অনুমোদনের হার ছিল খুবই কম। প্রথম ধাপের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ অনুমোদন বা স্বীকৃতি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিপুলসংখ্যক ভিত্তিহীন বা দুর্বল আশ্রয় আবেদন শুধু আবেদনকারীদের জন্য নয়, বৈধভাবে বিদেশে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের জন্যও নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।

সরকারের উদ্বেগ

বিদেশে স্থায়ীভাবে থাকার উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করার প্রবণতা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হকের বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক মামলা বা নিপীড়নের ঘটনা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বিদেশে গিয়ে অনিয়মিতভাবে আশ্রয়ের আবেদন করার প্রবণতা উদ্বেগের কারণ।

তিনি মনে করেন, মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা বাড়তে থাকলে প্রকৃত অর্থে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের আবেদনও বাড়তি সন্দেহের মুখে পড়তে পারে।

বৈধ পথেই বিদেশ যাওয়ার পরামর্শ

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডা ও ইউরোপের দেশগুলো এখন আবেদনকারীদের তথ্য যাচাইয়ে আগের চেয়ে বেশি প্রযুক্তি ও তথ্যভান্ডার ব্যবহার করছে। ফলে ভুয়া তথ্য বা সাজানো নথির মাধ্যমে আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা বৈধ অভিবাসনের উদ্দেশ্যে কানাডা ও ইউরোপে যেতে আগ্রহীদের সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, অনিয়মিত পথ বা ভিত্তিহীন আশ্রয় আবেদন সাময়িকভাবে সুযোগ তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ব্যক্তি ও দেশের জন্য নেতিবাচক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা ৯৬৮ বাংলাদেশির তথ্য তাই দেশটিতে অবস্থানরত এবং ভবিষ্যতে কানাডায় যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের জন্য অভিবাসন আইন ও নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।