মুক্তমন রিপোর্ট:
নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার বড়ইতলা এলাকায় নির্মাণাধীন নতুন জেলা কারাগারের নির্মাণকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত কাজের তুলনায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা বেশি বিল উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন-এর বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুছার বিরুদ্ধে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুছা। তাঁর দাবি, ‘এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি।’ তিনি জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগ দেখছে।
গণপূর্ত বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, প্রায় ২০ একর জমির ওপর নতুন জেলা কারাগার নির্মাণের কাজ প্রায় তিন বছর আগে শুরু হয়। প্রকল্পটির মোট চুক্তিমূল্য প্রায় ৬৭ কোটি টাকা। নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ধাপে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ কোটি টাকা বিল উত্তোলন করেছে। অথচ প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনা ও পরিদর্শনে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে। এ হিসাবে কাজের তুলনায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কার্যত কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও বর্তমানে সহজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও পর্যালোচনা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। এমনকি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দুই বছরের জন্য বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে এ সুপারিশের চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কী হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ ছাড়া অতিরিক্ত বিল হিসেবে ঠিক কত টাকা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং উত্তোলিত অর্থের কোনো অংশ সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ হয়েছে কি না—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগের পাশাপাশি নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুছার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ঠিকাদারের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগও অস্বীকার করেছেন এ এস এম মুছা। তিনি বলেন, ‘এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
নতুন জেলা কারাগারের নির্মাণকাজে ধীরগতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পুরোনো নরসিংদী জেলা কারাগারের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো কারাগারটির ধারণক্ষমতা প্রায় ৩০০ জন হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ বন্দি রয়েছেন। ধারণক্ষমতার প্রায় চারগুণ বন্দি থাকায় আবাসন, স্যানিটেশন, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া সামান্য বৃষ্টিতেই পুরোনো কারাগার এলাকার একটি বড় অংশ পানিতে তলিয়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে বন্দিদের পাশাপাশি কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও দুর্ভোগে পড়েন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন কারাগারটি দ্রুত নির্মাণ করে চালু করা গেলে অতিরিক্ত বন্দির চাপ কমার পাশাপাশি কারাগারের পরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন এত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। প্রকল্পের টেন্ডার নথি, কার্যাদেশ, চুক্তিমূল্য, সময়সীমা, মাপ বই, রানিং বিল, পরিশোধের ভাউচার এবং বাস্তব কাজের অগ্রগতি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশেষ করে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বিলের বিপরীতে ৩৫ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রকল্পের মাপ বই ও প্রকৌশলগত মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত বিল পরিশোধ হয়ে থাকলে কার অনুমোদনে, কোন পর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ের পর এবং কোন কর্মকর্তার স্বাক্ষরে তা পরিশোধ করা হয়েছে—তাও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণের দাবি উঠেছে।
সচেতন মহলের মতে, অভিযোগ সত্য হলে সরকারি অর্থের ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে তুলে ধরতে হবে।
নরসিংদীর নতুন জেলা কারাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার নির্মাণকাজে ওঠা অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত, স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক অডিট এবং প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।